মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
০৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৭ পিএম
বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে- এমন সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে এবার বড় খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিদেশি সম্পদের দিকে নজর দিচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ঋণগ্রহীতার বিদেশে থাকা সম্পদ খুঁজে বের করে জব্দ, বাজেয়াপ্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনতে আটটি আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। বিদেশে অর্থ স্থানান্তর, সম্পদ কেনা, বাড়ি, জমি ও ব্যবসায়িক সম্পদ গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন উপায়ে এসব ঋণগ্রহীতার অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসব সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রে থাকতে পারে।
দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রল, ইওয়াই ও ডেন্টনস, রহমান রাভেলি ও ইন্টারপাথ, বিসিজি ও এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস। এসব প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় সম্পদের অবস্থান, মালিকানা ও মূল্য নির্ধারণে কাজ করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদেশে থাকা কোনো সম্পদের অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর সেটি যাতে হস্তান্তর বা বিক্রি করা না যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কাঠামোর আওতায় সম্পদ স্থগিত বা জব্দ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে আদালতের আদেশসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা বিক্রি করে নগদায়নের চেষ্টা করা হবে। উদ্ধার করা অর্থ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে সরকারের এ উদ্যোগের প্রথম ধাপে অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দলের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কাস্টমসের গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর (সিআইআইডি) এবং আয়কর বিভাগের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। এই প্রক্রিয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি সম্পদ অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে সম্পদের মান দ্রুত অবনতি হচ্ছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে বড় অঙ্কের অর্থ সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকের মূলধন ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে থাকা সম্পদের পাশাপাশি বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ রয়েছে—এমন সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগকে ঋণ আদায়ের নতুন কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে কাজ শুরুর আগে তাদের কোনো ফি বা পরিচালন ব্যয় দিতে হবে না। কোনো সম্পদ শনাক্ত ও সফলভাবে উদ্ধার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে চুক্তিতে নির্ধারিত হারে উদ্ধার হওয়া সম্পদের মূল্যের একটি অংশ তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে। আর সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব না হলে তাদের কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ ব্যবস্থার ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপও কমবে। কারণ, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করতে শুরুতেই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে না। সম্পদ উদ্ধারের পরই তাদের পারিশ্রমিক দেওয়ার সুযোগ থাকছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন ও তদন্তে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানোর ফলে বিদেশে থাকা সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অবস্থান শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশের প্রচলিত ঋণ আদায় প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা সম্পদকে আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনা। কোনো ঋণগ্রহীতা বিদেশে অর্থ সরিয়ে নিয়ে বাড়ি, জমি, ব্যবসা বা অন্যান্য সম্পদ তৈরি করলে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে সরাসরি সেখানে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে এগোতে হয়। আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা নেওয়ার মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে বিদেশ থেকে সম্পদ উদ্ধার প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ হতে পারে। কারণ, প্রতিটি দেশের সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত, মালিকানা নির্ধারণ এবং অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে নিজস্ব আইন ও বিচারিক ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো সম্পদের অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর সেটি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসহ একাধিক আইনি ধাপ অতিক্রম করতে হতে পারে।
বর্তমানে বিদেশে থাকা সম্পদের সঠিক অবস্থান, মূল্য ও মালিকানা নির্ধারণের কাজ চলছে। কোনো সম্পদ প্রকৃতপক্ষে ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। তথ্য-প্রমাণ নিশ্চিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী সম্পদ স্থগিত বা জব্দ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা বিক্রি করে অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার চেষ্টা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো ঋণগ্রহীতার মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশেও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এ ধরনের ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। যেসব দেশে অর্থ বা সম্পদ পাচার হয়ে থাকতে পারে, সেসব দেশের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো সম্পদ উদ্ধার করা গেলে চুক্তি অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে।
টিএই/জেবি