Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

এলডিসি উত্তরণের পর সুযোগের পাশাপাশি বাড়বে চ্যালেঞ্জ, প্রস্তুতি কতটা?

মহিউদ্দিন রাব্বানি

৩১ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ এখন সময়ের অপেক্ষা। কয়েক দশকের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার স্বীকৃতি হিসেবে এই উত্তরণ দেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে এই অর্জনের পরই শুরু হবে নতুন বাস্তবতা। এতদিন এলডিসি পরিচয়ের কারণে রফতানি বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ যে বিশেষ সুবিধা পেয়েছে, উত্তরণের পর তার অনেকটাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এখন থেকেই অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও সক্ষম করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি উত্তরণকে সফল করতে শুধু সময়মতো উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, রফতানির বহুমুখীকরণ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। অন্যথায় অর্জনের চেয়ে চ্যালেঞ্জই বড় হয়ে উঠতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এলডিসি উত্তরণ

এলডিসি থেকে উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির পরিচয় পাবে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার নতুন বার্তা বিশ্বে পৌঁছাবে। কিন্তু একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা কমে আসবে। পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগিতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং অন্যান্য বিশেষ সুবিধাও ধীরে ধীরে সীমিত হবে। ফলে উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের প্রতিযোগিতা এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে দেশের প্রধান রফতানি খাতগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে।

জ্বালানি সংকট এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বর্তমানে শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় সংকট জ্বালানি। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পকারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, রফতানি আদেশ সময়মতো সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে এবং নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত একটি কৌশলগত সংলাপে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, এলডিসি উত্তরণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উত্তরণ-পরবর্তী সময়কে সফলভাবে মোকাবিলা করা। এজন্য সরকার গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং শিল্পে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তার মতে, জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠা গেলে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার জরুরি

এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শক্তিশালী আর্থিক খাতের বিকল্প নেই। কিন্তু খেলাপি ঋণ, উচ্চ ঋণসুদ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ কঠিন হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার বিভিন্ন প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে। এ লক্ষ্যে কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স এবং আমদানি-রফতানি নিবন্ধনসহ সরকারি সেবাগুলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।

রফতানিতে বাড়াতে হবে মূল্য সংযোজন

বাংলাদেশের রফতানির প্রধান ভরসা তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু এলডিসি সুবিধা শেষ হলে এই খাতকে আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, শুধু রফতানির পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, পণ্যে মূল্য সংযোজন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি রফতানি আয়ের একটি বড় অংশ দেশে ধরে রাখার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

তার মতে, জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি এবং স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হলে পোশাক শিল্পে অন্তত ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।

নীতিগত স্থিতিশীলতাই হতে পারে বড় শক্তি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান ও আইসিএমএবির সাবেক সভাপতি আবদুর রহমান খান মনে করেন, এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় সফল হতে হলে সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। তার ভাষায়, বাংলাদেশের মানুষের সক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা।

অন্যদিকে সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রফতানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নীতি সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার ওপর বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।

প্রস্তুতির সময় এখনই

বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গর্বের একটি অর্জন হলেও এটিকে শেষ গন্তব্য ভাবার সুযোগ নেই। বরং এটাই নতুন এক যাত্রার শুরু। সামনে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, রফতানির বহুমুখীকরণ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারলে এলডিসি উত্তরণের সুফল দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। অন্যথায় বিশেষ সুবিধা হারানোর পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এলডিসি উত্তরণে তাড়াহুড়োর চেয়ে টেকসই প্রস্তুতিই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

এমআর