মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
২৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
*বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৫৪১৪ কোটি টাকা
*তফসিলি ব্যাংক থেকে ঋণ ৩৭৯৫ কোটি টাকা
*সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা
*চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্য ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা
*রাজস্ব ঘাটতির কারণেই বাড়ছে ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা
*অতিরিক্ত সরকারি ঋণে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমার শঙ্কা
নতুন অর্থবছরের শুরুতেই ব্যয় নির্বাহে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা।
এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা এবং তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে ৩ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। অর্থবছরের শুরুতেই ঋণ গ্রহণের এ ধারা সরকারি ব্যয় মেটাতে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের নগদ অর্থের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংকিং খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ব্যাংক ঋণ নিয়েছিল। ওই অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেশি। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। সে বছর সরকার ব্যাংক থেকে নিট ঋণ নিয়েছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন>>
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংক ঋণ কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক হলেও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থবছরের শুরুতে বিভিন্ন কারণে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ে। তবে মূল কারণ হচ্ছে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া। তিনি বলেন, সরকারকে অবশ্যই বাজেটে নির্ধারিত ব্যাংক ঋণের সীমার মধ্যে থাকার চেষ্টা করতে হবে।
কারণ সরকার অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ কমে যায়। এতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে রাজস্ব আদায় জোরদার এবং ভ্যাট ও কর যথাযথভাবে আদায় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির কারণেই সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় সরকারের নগদ অর্থের চাহিদা বেড়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
তবে সরকার অতিরিক্ত ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর বড় একটি অংশের তহবিল সরকারি খাতে চলে যায়। ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনে নেওয়া ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স সুবিধার মাধ্যমে।
এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যা সরকারের দৈনন্দিন আয়-ব্যয়ের সাময়িক ঘাটতি পূরণে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে এই ঋণ পরিশোধ করতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ ধরনের ঋণ নতুন টাকা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হয়। বাকি ৩ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতেই সরকারি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় ব্যয় নির্বাহে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
টিএই/এআরএম