মাহফুজুর রহমান
১৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
ঢাকার একটি সেলুনে চুল কাটার পর ঝাড়ু দিয়ে এক কোণে জমা করা হয় কাটা চুল। কিছুক্ষণ পর সেটি চলে যায় একটি বস্তায়। অধিকাংশ মানুষের ধারণা, সেখান থেকে শেষ ঠিকানা ডাস্টবিন। কিন্তু ধারণাটি ভুল। মেঝেতে পড়ে থাকা এই চুলই ঘুরে ঘুরে পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক বাজারে। সেখান থেকে তৈরি হয় উইগ, হেয়ার এক্সটেনশন, টুপি ও হেয়ারপিস। আর ফেলে দেওয়া সেই চুল থেকেই প্রতি বছর আয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই মানবচুল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক। অথচ সম্ভাবনাময় এই শিল্পের বড় অংশই এখনও সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে।
দেশের বিভিন্ন গ্রামে এখনও বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাটা চুল সংগ্রহ করেন অনেক সংগ্রাহক। কোথাও নগদ টাকায়, কোথাও প্রসাধনী, খেলনা কিংবা ছোটখাটো গৃহস্থালি পণ্যের বিনিময়ে কেনা হয় চুল। চিরুনিতে জমে থাকা চুলও বাদ যায় না।
সংগ্রহ করা চুল প্রথমে যায় স্থানীয় আড়তদারদের কাছে। এরপর কয়েক ধাপ হাতবদল হয়ে তা পৌঁছে যায় বড় ব্যবসায়ীদের গুদামে। সেখানেই শুরু হয় চুল বাছাই, পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজ।

শুধু কাঁচামাল নয়, দেশেই তৈরি হচ্ছে উইগ
অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ থেকে শুধু কাঁচা চুলই রফতানি হয়। বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। দেশে মানবচুল দিয়ে উইগ, হেয়ার এক্সটেনশন, হেয়ারপিস ও টুপি তৈরির কারখানাও রয়েছে।
উত্তরার ফয়দাবাদ দীর্ঘদিন ধরে মানবচুল ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেখানে গড়ে উঠেছে গুদাম, চুল বাছাই কেন্দ্র এবং ছোট-বড় উইগ কারখানা। এ ছাড়া দিনাজপুর, ফরিদপুর ও নীলফামারীসহ বিভিন্ন এলাকাতেও এ শিল্পের বিস্তার ঘটেছে।
বাংলাদেশের চুলের বড় ক্রেতা চীন
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানবচুলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীনের ব্যবসায়ীরা। তারা সরাসরি বাংলাদেশে এসে চুল কেনেন। আবার স্থানীয় রফতানিকারকদের মাধ্যমেও চুল সংগ্রহ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় উইগ শিল্প গড়ে উঠেছে চীনে। বাংলাদেশ থেকে নেওয়া চুল সেখানে উন্নতমানের উইগ ও হেয়ার এক্সটেনশনে রূপান্তরিত হয়ে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বিক্রি হয়।
অবাক করা তথ্য, বাংলাদেশে চুলও আমদানি হয় শুধু রফতানিই নয়, বাংলাদেশে মানবচুল আমদানিও করা হয়।
২০২১ সালে প্রথমবারের মতো ভারত থেকে মানবচুল আমদানি শুরু হয়। কারণ, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত চুল দিয়ে দেশের উইগ কারখানাগুলোর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। সে সময় দিনাজপুর অঞ্চলের অন্তত ২৫টি কারখানায় আমদানিকৃত চুল দিয়ে উইগ উৎপাদনের তথ্য পাওয়া যায়। উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশই পরে বিদেশে রফতানি করা হয়।

জাপানি বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা
এই শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়ছে। একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জের জাপানিজ ইকোনমিক জোনে আন্তর্জাতিক মানের কাস্টমাইজড উইগ তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে জাপান ও সিঙ্গাপুরে রফতানি করছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
একটি মানসম্মত উইগ তৈরি করতে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগে। এ জন্য কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সৌন্দর্যের বাইরে মানবিক প্রয়োজনও
ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তারের মতে, প্রাকৃতিক মানবচুলের চাহিদা শুধু সৌন্দর্যসচেতনতার কারণে বাড়েনি; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও।
তিনি বলেন, কেমোথেরাপির কারণে অনেক ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর মাথার চুল ঝরে যায়। সে সময় উইগ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে দেয় না, রোগীর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি পুনরুদ্ধারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তার বলেন, দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। লিভার ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস ও কোলন ক্যান্সারের মতো রোগও বাড়ছে। এসব রোগের চিকিৎসার সময় অনেক রোগীর চুল পড়ে যায়। ফলে উইগের চাহিদাও বাড়ছে।

সম্ভাবনা আছে, নীতিগত সহায়তা কম
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে মানবচুল ও উইগের রফতানি কয়েক গুণ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক মানবচুলের চাহিদা বাড়তে থাকায় এটি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় রফতানি খাতে পরিণত হয়েছে।
তবে এই খাত এখনও সুসংগঠিত নয়। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং সরকারি নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।
ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তারের মতে, দেশে কাটা চুল দিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে পরচুলা তৈরির উদ্যোগ রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এ শিল্প গড়ে তোলা গেলে এটি উচ্চমূল্যের রফতানি খাতে পরিণত হতে পারে। এতে সরকার ভ্যাট, কর ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। একই সঙ্গে দেশের জিডিপিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

কাঁচামাল পাচার, হারাচ্ছে মূল্য সংযোজনের সুযোগ
ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তার অভিযোগ করেন, বর্তমানে বিপুল পরিমাণ মানবচুল অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাঁচামাল হিসেবে চুল বিদেশে চলে যাচ্ছে। পরে সেই চুল বিদেশে প্রক্রিয়াজাত হয়ে উইগে রূপান্তরিত হয় এবং অনেক বেশি দামে বিক্রি হলেও বাংলাদেশ সেই মূল্য সংযোজনের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তার মতে, সরকারিভাবে এ শিল্পকে স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে বড় শিল্প পর্যন্ত গড়ে উঠতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, কমবে বেকারত্বও।
তিনি আরও বলেন, অনেক পার্লারে গ্রাহকদের না জানিয়ে কিংবা কোনো পারিশ্রমিক না দিয়েই কাটা চুল আলাদা করে সংরক্ষণ করা হয়। বেশির ভাগ গ্রাহকই জানেন না, তাদের ফেলে দেওয়া চুলেরও বাজারমূল্য রয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
মেঝেতে পড়ে থাকা একগুচ্ছ চুল সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো বর্জ্য। কিন্তু সেই চুলই শত হাত ঘুরে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যায়, তখন সেটিই হয়ে ওঠে ডলারের পণ্য। বাংলাদেশের নীরব এই শিল্প তাই শুধু সৌন্দর্যপণ্যের কাঁচামালের গল্প নয়; এটি মূল্য সংযোজন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক অনালোচিত সম্ভাবনার গল্প।
এম/এআর