Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

উদ্বেগজনক প্রভিশন ঘাটতি, তাল মিলাচ্ছে সবল ব্যাংক

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

০৯ জুলাই ২০২৬, ১১:০৩ পিএম

  • খেলাপি ঋণের চাপে ‘উদ্বেগজনক’ প্রভিশন সংকট
  • প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ ১৬ ব্যাংক
  • ব্যাংক খাতের মোট প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা
  • রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঘাটতি ৭৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা
  • বেসরকারি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ কোটি টাকা
  • বিশেষায়িত ব্যাংকের ঘাটতি ২২২ কোটি টাকা

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি। কয়েকটি ব্যাংকে এ ঘাটতি ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যাংকিং খাতের ১৬টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এ তালিকায় শুধু দুর্বল নয়, কয়েকটি সবল ব্যাংকও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘শ্রেণীকৃত ঋণ ও প্রভিশন স্থিতি’ শীর্ষক এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংকগুলো তাদের আয় থেকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ নিম্নমানের খেলাপি হলে তার বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হলে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হলে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি মন্দ ঋণ। ফলে এর বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারছে না। একদিকে খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রভিশনের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে আয় কমে যাওয়ায় সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি বাড়ছে এবং পুরো ব্যাংক খাত আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঘাটতি ৭৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ১ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ২২২ কোটি টাকা।

তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ৭১ হাজার ৮৩৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসি, যার প্রভিশন ঘাটতি ৫০ হাজার ১৩১ কোটি ১ লাখ টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ছয়টির পাঁচটিতেই প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। এ খাতে মোট নিট ঘাটতির পরিমাণ ৭৪ হাজার ৪৭১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। জনতা ব্যাংকের পাশাপাশি রূপালী ব্যাংক পিএলসির ঘাটতি ১২ হাজার ৫৪৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির ১০ হাজার ৮৬৭ কোটি ৩ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের ৫ হাজার ১৮ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসির (বিডিবিএল) ৫৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এ খাতের ১০টি ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। মোট ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ইসলামী ব্যাংকের পর আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির ঘাটতি ২০ হাজার ৩৬৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের ১৯ হাজার ৮৭৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির ১০ হাজার ৭৮৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসির প্রভিশন ঘাটতি ৫ হাজার ১১৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসির ২ হাজার ৪৮২ কোটি ৩ লাখ টাকা, এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ১ হাজার ২৭৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির ৯১৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক পিএলসির ৬২৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং এনআরবি ব্যাংক লিমিটেডের ১০৩ কোটি টাকা।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবল প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ২২২ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কোনো প্রভিশন ঘাটতি নেই। বরং এ খাতে ৩৩৮ কোটি ৯২ লাখ টাকার প্রভিশন উদ্বৃত্ত রয়েছে, যা তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের পরও কয়েকটি ব্যাংক উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি ৪ হাজার ১৪৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকার উদ্বৃত্ত নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। এ ছাড়া পূবালী ব্যাংক পিএলসিসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণের পর উদ্বৃত্ত অবস্থানে রয়েছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রভিশন ঘাটতি মূলত খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল ঋণ পুনরুদ্ধার এবং প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থতার প্রতিফলন। বড় অঙ্কের এ ঘাটতি ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতা, মুনাফা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ পুনরুদ্ধার জোরদার করা এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ নিশ্চিত করা এখন ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

এ বিষয়ে অর্থনীতি গবেষক ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম. হেলাল আহম্মেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, মন্দ ঋণের বিপরীতে যে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা হয়, তা খেলাপি ঋণের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এভাবে খেলাপি ঋণ বাড়তে দেওয়া কোনো অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। ব্যাংক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক মজবুতি অর্জন না হলে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে আবারও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক হতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে তদারকি জোরদার করতে হবে।

এদিকে চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এ ছাড়া এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।

টিএই/এআর