নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য টেকসই ও সাশ্রয়ী উন্নয়ন অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া, ভূরাজনৈতিক বিভাজন এবং দাতা দেশগুলোর পরিবর্তিত অগ্রাধিকারের কারণে উন্নয়ন অর্থায়নের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থায় সংস্কার, জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ অব্যাহত রাখা জরুরি।
বুধবার (৮ জুলাই) সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওইসিডি মাল্টিল্যাটারাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ২০২৬ রিপোর্ট: পারস্পেকটিভস ফ্রম সাউথ এশিয়া শীর্ষক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, উন্নয়ন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, পুঁজিবাজার সংস্কার, বন্ড মার্কেটের বিকাশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু, খাদ্য ও জ্বালানি সংকটে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থা একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থায়নের ধারা পরিবর্তিত হওয়ায় এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
ওইসিডির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও আর্কিটেকচার অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের প্রধান অঁরি-বার্নার সোলিনিয়াক-লেকোম্তে বলেন, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যবস্থাকে শুধু টিকিয়ে রাখাই নয়, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠন করাও জরুরি। সাহসী ও সুপরিকল্পিত সংস্কারের মাধ্যমে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ধরে রাখা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ওইসিডির মাল্টিল্যাটারাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ২০২৬ প্রতিবেদনের সহ-প্রণেতা লিওনার্দো আলতিয়েরি জানান, ২০২৪ সালে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়নে মূল ও প্রকল্পভিত্তিক—উভয় ধরনের অবদান কমেছে। এর ফলে এক বছরেই প্রায় ১৫ শতাংশ অর্থায়ন হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া ২০২৩ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে উন্নয়ন সহায়তা কমিটির (ডিএসি) সদস্য দেশগুলোর বহুপাক্ষিক অর্থায়ন ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
একই প্রতিবেদনের সহ-প্রণেতা মারিউস গেরিন বলেন, ২০২৪ সালে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর অর্থ বিতরণ রেকর্ড পর্যায়ে থাকলেও এর আড়ালে চাপের লক্ষণ স্পষ্ট। তিনি বলেন, স্বল্পসুদে অর্থায়নই দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রধান ভরসা। কিন্তু আর্থিক সংকটের সময় এই অর্থায়নই প্রথমে কমে যায়।
পাকিস্তানের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আবিদ কাইয়ুম সুলেরি বলেন, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন রক্ষায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জরুরি। জলবায়ু দুর্যোগ ও উন্নয়ন সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা, স্বল্পসুদে ঋণ এবং অন্যান্য অর্থায়নের ব্যবস্থা পৃথকভাবে বিবেচনার আহ্বানও জানান তিনি।
সাউদার্ন ভয়েসের গবেষণা ও উদ্ভাবন বিভাগের প্রধান ড. প্রত্যুষ শর্মা বলেন, বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর বাজেট কমানোর প্রভাব কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর উন্নয়ন চাহিদা মূল্যায়নে শুধু মাথাপিছু আয় নয়, অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকও বিবেচনায় নিতে হবে।
নেপালের সাউথ এশিয়া ওয়াচ অন ট্রেড, ইকোনমিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. পারাস খারেল বলেন, টেকসই ও অপরিবর্তনীয় এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। কারণ বৈশ্বিক বা জলবায়ুজনিত যেকোনো ধাক্কায় অর্জিত উন্নয়ন অগ্রগতি পিছিয়ে যেতে পারে। তিনি উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে জলবায়ু অর্থায়নের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
শ্রীলঙ্কার সেন্টার ফর পোভার্টি অ্যানালাইসিসের গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ট্রান্সফরমেশন বিভাগের প্রধান ড. রোশান অ্যান পেরেরা বলেন, স্বল্পসুদে ঋণ ও অনুদান উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। এই সুবিধা অকালেই হারিয়ে গেলে দেশগুলোকে ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলবে।
পাকিস্তানের সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ আসিফ ইকবাল বলেন, উন্নয়ন অর্থায়ন এখন শুধু বাজেটের বিষয় নয়, এটি ভূরাজনৈতিক কৌশলেরও অংশ। তাই স্বল্পসুদে অর্থায়নের যোগ্যতা নির্ধারণে মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকি, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য, ঋণের স্থায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক বিষয়ক অনুবিভাগের মহাপরিচালক শাহ আসিফ রহমান বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং এলডিসি উত্তরণ সফল করতে উন্নত দেশ, উন্নয়ন অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
বক্তারা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থার সংস্কারে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো, সাশ্রয়ী ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং এলডিসি উত্তরণের পরও উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এএইচ/এআর