মহিউদ্দিন রাব্বানি
০৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:১১ পিএম
• জুনে রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ
• বছর শেষে কমেছে পোশাক রফতানি আয়
• শুল্ক অনিশ্চয়তায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রফতানি প্রবৃদ্ধি
• নতুন বাজার খোঁজার তাগিদ অর্থনীতিবিদদের
অর্থবছরের শেষ মাসে রফতানি আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি এলেও পুরো বছরের হিসাব শেষ পর্যন্ত স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে না। জুনে তৈরি পোশাক রফতানিতে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে দেশের প্রধান রফতানি খাতটির মোট আয় কমেছে। ফলে শেষ মুহূর্তের ইতিবাচক গতি সারা বছরের মন্দা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। রফতানিকারক, ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়া এবং প্রধান বাজারগুলোতে দুর্বল ভোক্তা চাহিদার কারণে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি দেশের রফতানি খাত।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত জুন মাসে দেশের মোট রফতানি আয় হয়েছে ৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগের তুলনায় ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি।
তবে পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। একই সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি আয় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। দেশের মোট রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাক খাত। ফলে এই খাতের আয় কমে যাওয়া শুধু শিল্পখাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
প্রতিযোগিতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চাপ: বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক অনিশ্চয়তা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় বার্ষিক রফতানি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ভারত ও ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, জুন মাসে প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হলেও প্রকৃত রফতানি আয় মাসিক গড়ের কাছাকাছিই ছিল। কারণ ২০২৫ সালের একই সময়ে ঈদুল আজহার ছুটির প্রভাব থাকায় তুলনামূলক ভিত্তি দুর্বল ছিল।
রফতানিকারকদের মতে, চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, জ্বালানি ব্যয়ের চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে ক্রয়াদেশের প্রবাহ স্বাভাবিক ছিল না। অনেক ক্রেতা দীর্ঘমেয়াদি অর্ডারের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি ও ছোট পরিসরের অর্ডার দিচ্ছেন, যা উৎপাদন পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে।

অর্থনীতির জন্য কী বার্তা: পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের রফতানি কাঠামো এখনো অত্যন্ত পোশাকনির্ভর। ফলে এই খাতে সামান্য পতনও সামগ্রিক রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। নতুন বাজার ও নতুন পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এখন সময়ের দাবি।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জুন মাসের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও সেটি পুরো বছরের দুর্বলতা ঢেকে দেয় না। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা না বাড়ালে ভবিষ্যতে বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে। তার মতে, রফতানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ, বিনিময় হার স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
ইপিবির আশাবাদ: তবে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখছে। সংস্থাটির মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং প্রধান রফতানি বাজারগুলোতে দুর্বল ভোক্তা চাহিদার মধ্যেও বাংলাদেশ রফতানি আয় প্রায় স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ইপিবি বলছে, রফতানি খাতের এই স্থিতিশীলতা খাতটির অন্তর্নিহিত সক্ষমতা ও অভিযোজন ক্ষমতার প্রতিফলন।
সামনে কী দেখছেন উদ্যোক্তারা: খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা কমতে শুরু করলে বাংলাদেশ আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারবে। তারা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের সংঘাত প্রশমিত হলে এবং জ্বালানি তেলের দাম কমলে উৎপাদন ব্যয়ও কমবে। তখন বিদেশি ক্রেতাদের নতুন অর্ডার বাড়বে এবং রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে।
অর্থবছরের শেষ মাসে রফতানির উজ্জ্বল প্রবৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি দিলেও বার্ষিক হিসাব বলছে দেশের প্রধান রফতানি খাত এখনও চ্যালেঞ্জের মধ্যেই রয়েছে। নতুন অর্থবছরে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলা এবং বাজার বৈচিত্র্য আনতে না পারলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমআর/ক.ম