images

অর্থনীতি

রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন কৌশল, আয়কর-ভ্যাট-কাস্টমসে তিন টাস্কফোর্স

মহিউদ্দিন রাব্বানি

১৮ জুন ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম

  • কর ফাঁকি ও জালিয়াতি রোধে তিন টাস্কফোর্স
  • আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসে পৃথক সংস্কার উদ্যোগ
  • মাসভিত্তিক পরিকল্পনায় রাজস্ব আদায় তদারকি
  • তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে নতুন পদক্ষেপ
  • উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জোর সরকারের

ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি, কর ফাঁকি, কর অব্যাহতির অপব্যবহার এবং সীমিত করভিত্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিয়েছে সরকার। আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস খাতে পৃথক তিনটি টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্তকে রাজস্ব প্রশাসনে দীর্ঘদিনের সংস্কার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। সরকারের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে, কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে এবং উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ সহজ হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত কয়েক বছরে জাতীয় বাজেটের আকার ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই অনুপাতে রাজস্ব আদায় বাড়েনি। ফলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সরকারি সেবাখাতে ব্যয় নির্বাহে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর অধিক নির্ভর করতে হচ্ছে। একই সময়ে কর-জিডিপি অনুপাতও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হয়নি। এ বাস্তবতায় কর প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস খাতের সমস্যাগুলো একে অপরের থেকে আলাদা। তাই একই কাঠামোর পরিবর্তে খাতভিত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এসব টাস্কফোর্স কর ফাঁকির ধরন শনাক্ত, কর অব্যাহতির যৌক্তিকতা পর্যালোচনা, রাজস্ব প্রশাসনের দুর্বলতা চিহ্নিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করবে।

অর্থ, পরিকল্পনা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, প্রতিটি টাস্কফোর্সের জন্য মাসভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা এবং নির্দিষ্ট মাইলফলক নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ নয়, নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট খাতের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় আনারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তার ভাষায়, কর ফাঁকি, কর জালিয়াতি এবং অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমিয়ে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি শক্তিশালী করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও তথ্যনির্ভর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো সীমিত করদাতা ভিত্তি। দেশের অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও করদাতার সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি। বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখনও কার্যকর কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। ফলে যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ পড়ে। নতুন টাস্কফোর্সগুলো কর নেট সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারলে রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

ড. তিতুমীর বলেন, সরকার বর্তমানে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, পুনর্বহাল এবং পুনর্গঠনের তিন ধাপের কৌশল অনুসরণ করছে। এ লক্ষ্যে ভোগব্যয় বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলেরই অংশ।

তিনি আরও বলেন, অতীতে রাজস্ব আদায়ের তথ্য উপস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের অমিলের কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ত। এই সমস্যার সমাধানে তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব প্রশাসনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে করদাতাদের জন্য সেবা গ্রহণও সহজ হবে। ডিজিটাল তথ্যভান্ডার, স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং তথ্য আদান-প্রদানের সমন্বিত ব্যবস্থা চালু করা গেলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব।

তবে শুধু রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোই সরকারের জন্য যথেষ্ট নয়। অর্থ উপদেষ্টা নিজেও পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে পরিচালন ব্যয় দ্রুত বাড়লেও মূলধনী ও উন্নয়ন ব্যয় সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় বেশি বাড়তে থাকলে তা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দেশে এমন বহু প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো বছরের পর বছর ধরে চললেও প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। বারবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে ড. তিতুমীর বলেন, প্রকল্প গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুমোদন, বাস্তবায়ন, তদারকি এবং মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনা হচ্ছে।

সরকার প্রকল্প তদারকিতে ড্যাশবোর্ডভিত্তিক ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যয় এবং বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি উন্মুক্ত তথ্যনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গবেষক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের জন্য তথ্যপ্রাপ্তি আরও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহল রাজস্ব সংস্কারের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেছেন, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, রাজস্ব আদায়ের অতিরিক্ত চাপ মাঠপর্যায়ে করদাতাদের হয়রানির কারণ হতে পারে। তাই রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল এমন হতে হবে, যাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। করদাতাবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার পাশাপাশি কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন তিনটি টাস্কফোর্স গঠন সরকারের জন্য একটি পরীক্ষাও বটে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কারের কথা বলা হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি খুব বেশি দেখা যায়নি। এবার যদি তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং নিয়মিত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

তাদের মতে, আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করবে এই সংস্কার উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতার ওপর। সে কারণে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস খাতে গঠিত নতুন তিন টাস্কফোর্সকে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

এমআর/এএস