নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
চট্টগ্রাম বন্দরকে জিম্মিদশা থেকে ফেরাতে সংস্কার কাজের উদ্যোগে বেসামাল হয়ে পড়েছেন লুটেরারা। এর মধ্যে বন্দরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে জড়িত বহিরাগত সিন্ডিকেটও। যারা রাজনৈতিক বা বিভিন্ন সংগঠনের পরিচয়ে এই সংস্কার কাজের বিরোধিতা করে আসছেন।
এমনকি দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে বহিরাগতরা কর্মবিরতি কর্মসূচি দিয়ে বন্দরের সার্বিক অপারেশনাল কার্যক্রম ব্যাহত করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারের রাজস্ব আয়। যারা এসব করছেন তারা দেশের চেয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন- এমন মন্তব্য করেছেন বন্দরের সংস্কার কাজের উদ্যোগে সমর্থিত বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এমনকি বন্দরের সংস্কার কাজের উদ্যোগের প্রতি চট্টগ্রামের ৯৯ ভাগ মানুষের সমর্থন রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। কিন্তু সিন্ডিকেট চক্রের মতো সংঘবদ্ধ না থাকায় এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চট্টগ্রামের মানুষের কথা কেউ শুনছে না।
বন্দর সংস্কার কাজের উদ্যোগের প্রতি সমর্থিতদের ভাষ্য, সংস্কার কাজের উদ্যোগের বিরোধিতাকারীরা চট্টগ্রামের বাইরের লোক। যাদের বেশির ভাগ মাদারীপুর, রংপুর, বরিশাল, কুমিল্লাা ও নোয়াখালীর বাসিন্দা। যাদের বিরুদ্ধে বন্দর লুটে-পুটে খাওয়ার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এরপরও সংঘবদ্ধ হয়ে হয়ে তারা বন্দরের সংস্কার কাজের উদ্যোগের বিরোধিতা করে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছেন।
সূত্র মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে টার্মিনাল থেকে জেটি এবং বহিঃনোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামার কাজে নতুন অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। যেখানে ২০০৮ সালের পর থেকে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর।
এ সুবাধে ১৮ বছর ধরে সুকৌশলে রাজনৈতিক ও বিভিন্ন সংগঠেনের পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে ইচ্ছেমতো বন্দরের অর্থ ও সম্পদ লুটপাট করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকৃত পণ্যের কন্টেইনার ছাড়, রফতানিকৃত পণ্যের কন্টেইনার পাচার, কন্টেইনার চুরিসহ নানা কলাকৌশল করে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব মেরেছে। আবার এই রাজস্ব বিদেশে পাচারও করেছে। যা নতুন অপারেটর নিয়োগে বড় ধরনের হোঁচট খাবে এই লুটেরা সিন্ডিকেট।
এ কারণেই নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নতুন অপারেটর নিয়োগে একাধিকবার দরপত্র প্রকাশ করলেও বন্দরে কর্মরত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ছলচাতুরতায় কঠিন কিছু শর্তের কারণে নতুন কোনো কোম্পানি এই খাতে প্রবেশ করতে পারেনি। প্রতিযোগিতা না থাকায় সেবার মানে ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত হয়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষ চাইছে অপারেটর সংখ্যা বাড়াতে। কিন্তু তার বিরোধিতা করছেন লুটেরা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা।
সূত্র মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে বন্দরে ২৩ প্রতিষ্ঠানকে অপারটের নিয়োগ দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেসব প্রতিষ্ঠানের সাথে আরও ২৩ অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয়। এখন বিএনপি সরকার পুনরায় নতুন অপারেটর নিয়োগে সম্মতি দিয়েছে বলে জানান বন্দর কর্তৃপক্ষ। যার বিরোধিতা করছেন বর্তমান অপারেটররা। এমনকি অপারেটররা উচ্চ আদালতে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন বলে সূত্র জানায়। এই অবস্থায় নতুন অপারেটর প্রক্রিয়া শেষ পর্যস্ত কতটা সফল হয় তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
তবে নতুন অপারেটর নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রেখেছে বলে জানান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের সচিব নাসির উদ্দিন এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেইলকে বলেন, নতুন লাইসেন্স দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে। আগে যারা আবেদন করেছেন, এই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তাদের নতুন করে আবেদনের দরকার নেই। আর কতজনকে দেওয়া হবে সেটি কমিটিই নির্ধারণ করবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব প্রক্রিয়ায় চলমান রাখবে বলে জানান তিনি।
বন্দরের এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের প্রতিনিধিত্বকারী বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সারওয়ার হোসেন সাগর ঢাকা মেইলকে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলেও ২৩টি দলীয় বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। এখন আবারো বিএনপি দলীয় বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ঢালাওভাবে লাইসেন্স দেওয়া হলে এই কাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।
একইভাবে বিরোধিতা করছে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের নেতা বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম জানান, বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য উঠানামা একটি বিশেষায়িত কাজ। এখানে যন্ত্রপাতি এবং শ্রমিকদের সমন্বয়ে জটিল কাজ করতে হয়। এখানে নতুন-অনভিজ্ঞদের লাইসেন্স দেওয়া নিয়ে আমাদের আপত্তি আছে। কত লাইসেন্স দেওয়া প্রয়োজন সেটিও আগে নিশ্চিত হতে হবে, স্টেকহোল্ডারদের সাথে বসতে হবে। আর অনভিজ্ঞরা কাজ পেলে বন্দরের এখনকার যে সেবা সেটি দারুণভাবে বিঘ্নিত হবে।
আরেক শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, লাইসেন্সের একটির আবেদন ফি এক লাখ টাকা। আগে তিনশ আবেদন জমা পড়েছে। এখন আরও একশসহ মোট ৪০০ আবেদন জমা পড়লে বন্দর চার কোটি টাকা আয় করবে। পুরো টাকাই নন-রিফান্ডেবল। বন্দর কর্তৃপক্ষ এভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
তাদের ভাষ্যমতে, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মোট ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার টন খোলা ও কন্টেইনারজাত পণ্য (কার্গো) উঠানামা করেছে। আর জেটি, টার্মিনাল মিলিয়ে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার একক কন্টেইনার উঠানামা হয়েছে। পুরো কাজ করেছে ৪৬ অপারেটর। জাহাজ ভেড়ানো, পণ্য উঠানামা, ইয়ার্ডে রাখাসহ নানা খাতে ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর আয় করেছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কাগো বার্থের (জিসিবি) ১২ জেটিতে পণ্য ওঠানামার কাজ করছে ১২ প্রতিষ্ঠান। দুটি টার্মিনাল চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং নিউমুরিং কন্টেইনার টামিনালে (এনসিটি) কাজ করছে দেশি প্রতিষ্ঠান। আর পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) কাজ করছে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। বহির্নোঙর সাগরে জাহাজ থেকে পণ্য স্থানান্তর (লাইটারিং) কাজে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে কাজ করছে ৩৩ প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে ৪৮টি অপারেটর প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
এ বিষয়ে বন্দরের বার্থ অপারেটর পারভেজ আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, লাইসেন্স দিলেই যে সবাই পণ্য ওঠানামা বা অপারেটিংয়ের কাজ পাবে বিষয়টি এমন নয়। জেটিতে কাজ পেতে তো নির্দিষ্ট যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। সেটা যে প্রতিষ্ঠানের আছে সেই প্রতিষ্ঠানই কাজ পাবে। সুতরাং পুরনো যারা আছে অভিজ্ঞতা অনুযায়ী তারাই কাজ বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
আইকে/জেবি