মহিউদ্দিন রাব্বানি
১৫ জুন ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নির্মাণসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের প্রভাবে দেশের নির্মাণ খাত নতুন করে চাপে পড়েছে। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে রডের দাম ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে সিমেন্ট, পাথর, বালু ও ইটসহ প্রায় সব ধরনের নির্মাণ উপকরণের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। ফলে আবাসন শিল্প, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং নির্মাণসংশ্লিষ্ট শতাধিক খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং বাজেটে আরোপিত নতুন করের সম্মিলিত প্রভাবে বাড়ি নির্মাণের খরচ আরও বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নতুন ফ্ল্যাট ও বাড়ির দামে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের নিজের একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগে ৭৫ গ্রেডের রড প্রতি টন ৮০ থেকে ৮৩ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ৯০ থেকে ৯৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে ৬০ গ্রেডের রডের দামও টনপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা বেড়েছে।
রাজধানীর পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, গত দুই সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই রডের দর পরিবর্তন হয়েছে। আগে প্রতি কেজি রড ৮৯ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ৯৫ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
পুরান ঢাকার আলুবাজারের রড ও ইস্পাত ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, অনেক দিন ধরেই রড ও ইস্পাতের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে বাজেটে কর বৃদ্ধির প্রস্তাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর প্রভাব এখন থেকেই বাজারে দেখা যাচ্ছে। এতে আবাসন খাতের জন্য নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
একই এলাকার ব্যবসায়ী সেলিমুল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম বেড়েছে, জাহাজ ভাড়া বেড়েছে, ডলারের চাপও বেড়েছে। ফলে আগের দামে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নয়, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। মিল পর্যায়ে রডের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পাইকারি ও খুচরা বাজারে পড়ছে।
আরও পড়ুন
উচ্চাশার বাজেট, বাস্তবতার পরীক্ষা
রডের পাশাপাশি সিমেন্ট, পাথর ও ইটের বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নির্মাণসামগ্রী বিক্রেতারা বলছেন, প্রায় প্রতিটি উপকরণের দামই বাড়ছে। ফলে নতুন ভবন নির্মাণের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং অনেক গ্রাহক নির্মাণকাজ পিছিয়ে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ ঢাকা মেইলকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া এবং আমদানি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূলধন সংকটের কারণে শিপ ব্রেকার ও শিল্প মালিকরা আগের মতো কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না। ফলে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে এবং এর সরাসরি প্রভাব রডের বাজারে পড়ছে।
এই ব্যবসায়ী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী মাসগুলোতে কাঁচামালের বাজার আরও অস্থির হতে পারে। এতে রডের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এমএস রড ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর ও ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব শিল্পসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। তাদের মতে, এই কর বৃদ্ধির ফলে প্রতি টন রডের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়বে।
রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিদ্যুৎনির্ভর এই শিল্পে বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
সিমেন্ট বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন কোম্পানি ইতোমধ্যে ব্যাগপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে। ডিলাররা বলছেন, কাঁচামাল আমদানির ব্যয়, শিপিং চার্জ এবং বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো নতুন করে মূল্য সমন্বয় করছে।
রাজধানীর বাড্ডা এলাকার নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ী রহমত উল্লাহ বলেন, রডের পাশাপাশি সিমেন্ট, পাথর ও অন্যান্য উপকরণের দামও বাড়ছে। এতে নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক গ্রাহক এখন নতুন নির্মাণকাজ শুরুর আগে কয়েকবার হিসাব-নিকাশ করছেন।
নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ আবাসন খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) বলছে, উচ্চ সুদহার, বিক্রয় স্থবিরতা এবং বিনিয়োগ সংকটের মধ্যেই আবাসন খাত কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, দেশের আবাসন খাতের সঙ্গে প্রায় ২৬৯টি শিল্পখাত জড়িত এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
রিহ্যাব সভাপতি বলেন, রড, পিভিসি রেজিন, পেট রেজিন, কোল্ড-রোল্ড কয়েল, কপার তার ও কপার টিউবের ওপর কর বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপর পড়বে।
রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ বলেন, বর্তমানে আবাসন খাত এক ধরনের সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। বিশেষ করে রডের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কিন্তু বাজার পরিস্থিতির কারণে ডেভেলপাররা একই হারে ফ্ল্যাটের দাম বাড়াতে পারছেন না।
এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, নির্মাণ ব্যয় বাড়তে থাকলে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এতে আবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার শ্রমিক, প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়বেন। একই সঙ্গে নতুন ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
নির্মাণ খাতের ঠিকাদাররাও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক সরকারি প্রকল্পের কাজ থমকে গিয়েছিল। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং বাজেটে প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধি বহাল থাকলে নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়বে। এতে সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প, বেসরকারি আবাসন এবং ব্যক্তি পর্যায়ের বাড়ি নির্মাণ সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তাদের দাবি, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে কাঁচামালের দাম বাড়লেও স্থানীয় বাজারে যাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি না হয়, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত কর পুনর্বিবেচনা, সহজ শর্তে গৃহঋণ এবং আবাসন খাতের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যুদ্ধ, জ্বালানি ব্যয় ও কর বৃদ্ধির এই ত্রিমুখী চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু নির্মাণসামগ্রীর বাজারই নয়, পুরো আবাসন খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নতুন ফ্ল্যাট ও বাড়ির দাম বাড়ার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়বে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য নিজের একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন আরও ব্যয়বহুল ও দূরবর্তী হয়ে যেতে পারে।
এমআর/জেবি