images

অর্থনীতি

এডিপির বড় অংশ মেগা প্রকল্পে, বরাদ্দের শীর্ষে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র

আব্দুল হাকিম

১৫ জুন ২০২৬, ০১:০৬ পিএম

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর আধিপত্য স্পষ্ট হচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল সম্প্রসারণ ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশই সীমিত কয়েকটি মেগা প্রকল্পের মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকছে।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ ১৫টি বৃহৎ প্রকল্পের জন্য মোট ৫৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেলের একাধিক লাইন এবং মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প মিলেই বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি পাচ্ছে। আর এককভাবে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প।

সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও পানি ব্যবস্থাপনা খাতের মাঝারি প্রকল্পগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও বরাদ্দের চিত্রে এখনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের প্রাধান্যই স্পষ্ট।

একক প্রকল্প হিসেবে রূপপুরে আগামী অর্থবছরে ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ বরাদ্দ প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক প্রকল্প সহায়তা থেকে এবং ৮১১ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে।

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে পরিচিত রূপপুর প্রকল্পের  এ নিয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা।

ruppur-plant_20
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

গত বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল ৬৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। ইতোমধ্যে এতে ব্যয় হয়েছে ৯৪ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।

প্রস্তাবিত এডিপিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে ঢাকা গণ দ্রুত পরিবহন উন্নয়ন প্রকল্প (মেট্রোরেল লাইন–৫ উত্তর রুট)। সাত বছর আগে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের জন্য আগামী অর্থবছরে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজধানীর যানজট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। তবে এ পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে সেই বরাদ্দ প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে বিবেচিত এই প্রকল্পে আগামী অর্থবছরে ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও সামুদ্রিক অর্থনীতি শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। সে তুলনায় আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ চারগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে এই প্রকল্প।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বড় জাহাজ নোঙরের সুযোগ সৃষ্টি এবং সামুদ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এডিপির খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শীর্ষ তিন প্রকল্পের বাইরেও রাজধানীকেন্দ্রিক আরও কয়েকটি মেট্রোরেল প্রকল্প বড় অঙ্কের অর্থ পাচ্ছে। ঢাকা গণ দ্রুত ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্প (লাইন-১) আগামী অর্থবছরে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেতে যাচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা হলেও এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। তবুও এর বরাদ্দ ৩৮৮ শতাংশের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ও পূর্বাচল পর্যন্ত রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার এ প্রকল্পকে রাজধানীর ভবিষ্যৎ গণপরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে বাস্তব অগ্রগতি কম হলেও বরাদ্দে বড় ধরনের বৃদ্ধি রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে আংশিকভাবে চালু হওয়া এবং সমাপ্তির পথে থাকা মেট্রোরেল লাইন-৬ প্রকল্পের জন্য আগামী অর্থবছরে ১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ইতোমধ্যে ৭৮ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে থাকায় নতুন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর তুলনায় এর অর্থায়নের চাহিদা কমেছে।

উন্নয়ন বাজেটে বিদ্যুৎ খাতেও উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডিপিডিসি) এলাকার বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ ও বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।

শিক্ষাখাতেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষায় শিখন ত্বরান্বিতকরণ প্রকল্পের বরাদ্দ ২১৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুষ্টি কর্মসূচির জন্য আগামী অর্থবছরে ২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতির কোনো তথ্য এখনো নথিভুক্ত হয়নি। শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে অগ্রগতির তথ্য ছাড়াই বড় অঙ্কের বরাদ্দের প্রস্তাব প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

পরিবহন খাতেও সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, চট্টগ্রাম-দোহাজারী দ্বৈত গেজ রেলওয়ে রূপান্তর প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য অর্থ পাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সড়ক ও রেল যোগাযোগের আধুনিকীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং সমুদ্রবন্দরগুলোর মধ্যে সংযোগ উন্নত করার লক্ষ্য সামনে রেখে এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে।

তবে সব প্রকল্পের বরাদ্দ বাড়ছে না। প্রস্তাবিত এডিপিতে ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়ক প্রকল্প এবং এলেঙ্গা-হাটিকামরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণসহ কয়েকটি চলমান বৃহৎ প্রকল্পের বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন পর্যায়, অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা এবং অগ্রগতির ভিত্তিতে এ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।

বরাদ্দ বৃদ্ধির তালিকায় রয়েছে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। প্রকল্পটির বরাদ্দ ৬ দশমিক ৭৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ১৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হচ্ছে। চলমান নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে এ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী অর্থবছরের এডিপি শুধু অবকাঠামো নির্মাণনির্ভর নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো মানব উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট খাতগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সামগ্রিক বরাদ্দের চিত্র বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, উন্নয়ন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো কয়েকটি মেগা প্রকল্পের দখলে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেলের একাধিক লাইন এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প মিলে এডিপির একটি বড় অংশ নিজেদের দখলে রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, ব্যয় দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। কারণ অতীতে বহু প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, সময়সীমা সম্প্রসারণ এবং ধীরগতির বাস্তবায়নের নজির রয়েছে। ফলে বিপুল অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

এএইচ/এমআর