images

অর্থনীতি

জ্বালানি আমদানি বাড়লেও পোশাক খাতে ‘অশনিসংকেত’

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

০৪ মে ২০২৬, ০৭:০৭ এএম

  • ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৫২ শতাংশ
  • একই সময়ে পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৮ শতাংশের বেশি
  • কাঁচা তুলা, সুতা ও টেক্সটাইল সামগ্রী—সব ক্ষেত্রেই আমদানি হ্রাস
  • ভোগ্যপণ্য আমদানিতে কিছুটা ধীরগতি
  • মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে সামান্য প্রবৃদ্ধি
  • সার আমদানিতে বড় লাফ—ব্যয় বেড়ে ৩১৭ কোটি ডলার
  • মোট আমদানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,৮৭২ কোটি ডলার

দেশে কয়েক মাস ধরেই আমদানি খাতে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে জ্বালানি আমদানিতে। তারপরও গত কয়েক মাস ধরে বড় সংকট দেখা দেয়। বিপরীতে শিল্প উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। যা সাধারণত ভবিষ্যৎ রপ্তানির নেতিবাচক পূর্বাভাস দিচ্ছে। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৫২ শতাংশ। বিপরীতে পোশাক বা আরএমজি সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি কমেছে ৮ শতাংশের বেশি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এই খাতের জন্য এক বড় ধরনের ‘অশনিসংকেত’।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৩৬২ কোটি ২৪ লাখ ডলার, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ কোটি ৬৭ লাখ ডলারে। এর মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৮৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার এবং পরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪৬২ কোটি ১২ লাখ ডলার।

বিপরীতে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক বা আরএমজি সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এই খাতে আমদানি ব্যয় ছিল ১ হাজার ২৬৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬৪ কোটি ৮ লাখ ডলারে। এই খাতের ভেতরে প্রধান কাঁচামাল কাঁচা তুলা (র-কটন) আমদানিতে ব্যয় ২৩২ কোটি ৫৬ লাখ ডলার থেকে কমে ১৯৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে নেমেছে। একইভাবে সুতা (ইয়ার্ন) আমদানিতে ব্যয় ২৪৩ কোটি ৩৪ লাখ ডলার থেকে কমে হয়েছে ২১৩ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। বস্ত্র ও টেক্সটাইল সামগ্রী আমদানিতেও ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ৬০২ কোটি ২৮ লাখ ডলারে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এই ঘাটতি ভবিষ্যতে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমদানির এই কাঠামোগত পরিবর্তন শুধু তাৎক্ষণিক ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং সামনে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে। একদিকে বাড়তি জ্বালানি ও খাদ্য আমদানি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়া উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের গতিতে ধীরগতি আনতে পারে—যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা।

তথ্য বলছে, খাদ্যপণ্য আমদানিতে ব্যয় গতবারের ১৩৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে এবার ১৮৪ কোটি ৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে । এর মধ্যে চাল আমদানিতে ৩৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলার এবং গম আমদানিতে ১৪৫ কোটি ৫৪ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিতে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। গত বছরের ৩৭৭ কোটি ৯ লাখ ডলারের বিপরীতে এবার এই খাতে ব্যয় হয়েছে ৩৪২ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। এর মধ্যে গুঁড়ো দুধ ও ক্রিম আমদানিতে ৩২ কোটি ৭৫ লাখ ডলার ব্যয় হলেও মসলা আমদানিতে ব্যয় কমে হয়েছে ২৭ কোটি ৬১ লাখ ডলার। ভোজ্যতেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৭৪ কোটি ৬৬ লাখ ডলার এবং চিনি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৬৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। ডাল জাতীয় পণ্য আমদানিতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৭১ লাখ ডলারে।

এদিকে কৃষি খাতের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সার আমদানিতে বড় লাফ দেখা গেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে যেখানে ১৯৭ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের সার আমদানি হয়েছিল, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৭ কোটি ৮ লাখ ডলারে। অন্যান্য মধ্যবর্তী পণ্যের মধ্যে রাসায়নিক আমদানিতে ২৫৩ কোটি ৬৮ লাখ ডলার এবং ক্লিঙ্কার আমদানিতে ৫৭ কোটি ৪২ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। তবে লোহা ও ইস্পাত আমদানিতে ব্যয় কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬১ কোটি ৩৫ লাখ ডলারে।

অন্যদিকে, দেশের শিল্পায়নের সক্ষমতা নির্দেশক মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানিতে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গতবারের ১৯৬ কোটি ২৫ লাখ ডলারের বিপরীতে এবার ২০৭ কোটি ৫১ লাখ ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। অন্যান্য মূলধনী পণ্যসহ এই খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ৬৬৫ কোটি ৯ লাখ ডলার।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে মোট আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৮৭২ কোটি ৭১ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ জ্বালানি ও খাদ্যের পেছনে ব্যয় বাড়ায় সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বাড়লেও, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ভাটা পড়া দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, জ্বালানি আমদানি বাড়লেও একই সময়ে পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়া ইঙ্গিত দেয় রপ্তানি ও শিল্প উৎপাদনের গতি ক্রমশ নিম্নমুখী। পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি কমা বেশ উদ্বেগজনক। এটি নির্দেশ করে নতুন রপ্তানি আদেশ কমেছে, কারখানাগুলো উৎপাদন কমেছে, ব্যবসায়ীরা ডলার সংকট বা ব্যাংক এলসি সমস্যায় পড়ছে। এটি মুলত অর্থনীতিতে ডাবল প্রেসার তৈরি করছে। এই দুই প্রবণতা একসাথে দেখা মানে অর্থনীতির উৎপাদনমুখী অংশ দুর্বল হচ্ছে, কিন্তু ব্যয়মুখী অংশ বাড়ছে। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা, শিল্প উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির জন্য চাপের কারণ হতে পারে।

টিএই/এএস