images

অর্থনীতি

বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতায় চাপে দেশের জ্বালানি ও অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ মে ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী চাপে রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন, কৃষি, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে প্রভাব ফেলছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—এ চাপ সাময়িক, নাকি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে।

শনিবার (২ মে) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ফ্ল্যাগশিপ ওয়েবিনার ‘আজকের অ্যাজেন্ডা: জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে জ্বালানি ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক, সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়।

ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ. সত্তার মন্ডল, ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের (টিএসআই) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ এবং বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হকসহ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা।

আলোচনায় উঠে আসে, জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা, চাহিদা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং যোগাযোগ ঘাটতির কারণে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের সরবরাহ বিঘ্ন দ্রুতই আতঙ্কজনিত ক্রয় আচরণে রূপ নেয়, ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। রেশনিংয়ের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জ্বালানি মজুত করতে শুরু করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান বলেন, জ্বালানি মজুত সক্ষমতা সীমিত থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে মূল্য সমন্বয় করতে হলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ সত্তার মন্ডল বলেন, কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণের ফলে ডিজেলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৪২ লাখ ডিজেলচালিত ইঞ্জিন কৃষিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এবং জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়াবে।

ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বাড়লে দেশের বৈদেশিক ব্যয়ও বেড়ে যায়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির বিকল্প উৎস এবং বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখা এবং আমদানি করা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্প ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

আলোচনায় আরও বলা হয়, সরবরাহ পরিস্থিতিতে বড় উন্নতি না হলেও চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে বিভিন্ন পাম্পে জ্বালানির অসম বণ্টন এবং গণমাধ্যমে স্থানীয় সংকটের অতিরিক্ত প্রচার জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, যা সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। নতুন কূপ খননের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও তা দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, আমদানি পরিকল্পনা এবং মধ্যমেয়াদি কৌশল আরও জোরালোভাবে বাস্তবায়ন না হলে এ সংকট পুনরাবৃত্তি হতে পারে। নীতিনির্ধারণে শুধু চাহিদা নিয়ন্ত্রণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল প্রচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল বার্তা দেওয়ার কারণে আতঙ্ক ও মজুত প্রবণতা বাড়তে পারে, যা সংকটকে আরও জটিল করে তোলে।

এএইচ/এএইচ