images

অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতির চাপে সঞ্চয়পত্রে ছন্দপতন!

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৬ পিএম

 

  • দুই মাসেই নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা
  • চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে মোট ঋণাত্মক বিনিয়োগ ৫৫৫ কোটি টাকা
  • ট্রেজারি বিল-বন্ডে ঝুঁকছে বিনিয়োগকারীরা
  • বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে
  • টানা কয়েক বছর ধরেই নেতিবাচক ধারায় সঞ্চয়পত্র খাত

মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামের চাপে টিকে থাকতে গিয়ে সঞ্চয়ের ভাণ্ডার ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সঞ্চয়পত্র খাতে-যেখানে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে ভাঙানোর প্রবণতা। ফলে দীর্ঘদিনের নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত এই খাতে তৈরি হয়েছে এক ধরনের নীরব সংকট। সর্বশেষ জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে মোট সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার মতো, অথচ একই সময়ে ভাঙানো হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসেই নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। যদিও অর্থবছরের শুরুর দিকে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা ছিল, সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫৫ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা শুধু সাময়িক চাপ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত দুর্বল করে দিতে পারে। কারণ সঞ্চয় কমে গেলে বিনিয়োগের উৎস সংকুচিত হয়, যা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের যে ঋণ আসে, তা কমে গেলে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। খাতসংশ্লিষ্টদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতিই এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ। দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার আয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে পূর্বের সঞ্চয় ভেঙে খরচ মেটাতে হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ওপর এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে।

এদিকে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমে যাওয়াও বিনিয়োগে আগ্রহ কমিয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে সুদের হার কমিয়ে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সুদের হার বাড়ায় ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ সেদিকে ঝুঁকছে। পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আচরণে প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগ না করে পুরোনো সঞ্চয় তুলে নগদ রাখাকে নিরাপদ মনে করছেন।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা, বিপরীতে ভাঙানো হয়েছে ৭ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। এতে ওই মাসে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে বিক্রি ছিল ৭ হাজার ১৬১ কোটি টাকা, আর ভাঙানো হয় ৯ হাজার ১২ কোটি টাকা-ফলে ওই মাসে ঋণাত্মক নিট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তবে ডিসেম্বর মাসে প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকার ইতিবাচক নিট বিনিয়োগ হয়েছিল, আর তার আগের পাঁচ মাসের মধ্যে চার মাসেই ইতিবাচক ধারা ছিল।

চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পেছনের বছরগুলোর চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার কোনো নিট ঋণ পায়নি; বরং নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ ঋণাত্মক পরিমাণ ছিল প্রায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ টানা কয়েক বছর ধরেই সঞ্চয়পত্র খাতে নেতিবাচক ধারা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও নয় মাস না পেরোতেই তা ছাড়িয়ে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকায়। এতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সঞ্চয়পত্র খাতের এই নীরব সংকট মোকাবিলায় সুদের হার পুনর্বিবেচনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

টিএই/এমআই