সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন, পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি চরমে

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম

শেয়ার করুন:

চাহিদার বিপরীতে বাড়ছে লোডশেডিং, গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় অন্ধকারে জনজীবন
লোডশেডিংয়ে বাড়ছে ভোগান্তি, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও শিক্ষার্থীরা।
    • লোডশেডিংয়ে উৎপাদন কমায় লোকসানের মুখে শিল্পোদ্যোক্তারা
    • বিদ্যুৎ-ডিজেল সংকটে হুমকিতে বোরো চাষাবাদ, শিক্ষার্থীসহ বিপর্যস্ত জনজীবন
    • শহরে এক-দুই ঘণ্টা, গ্রামে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং
    • জ্বালানি সংকটে বন্ধ ১৮ কেন্দ্র, ৩৫টি আংশিক উৎপাদনে
    • দৈনিক গড়ে ঘাটতি ১০০০ মেগাওয়াটের বেশি

দেশজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন না বাড়ায় লোডশেডিং নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে অন্তত ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরের তুলনায় পল্লী এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা কয়েকগুণ বেশি। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।

শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কমে লোকসানের শঙ্কা
শিল্পাঞ্চলখ্যাত গাজীপুরে প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করলেও ডিজেল সংকটে সেটিও নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না।

বিকল্প হিসেবে অনেক উদ্যোক্তা এখন ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু বাজারে ডিজেলের ঘাটতি থাকায় সেই জেনারেটর চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকছে, শ্রমিকদের অনেক ক্ষেত্রেই অলস বসে থাকতে হচ্ছে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্পখাত সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং ব্যবসায়ীদের আর্থিক লোকসান বাড়ছে।

স্থানীয় একটি কারখানার মালিক শাহ আলম বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি আরও জানান, বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালানোর চেষ্টা করা হলেও সেখানে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। পাম্পে পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না, আর যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে সেটিও আগের তুলনায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে কারখানার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয় এক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে শুধু উৎপাদনই কমছে না, যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও চাপ তৈরি হচ্ছে।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩১২ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়ে গড়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন: গাজীপুরে লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি চরমে, লোকসানের মুখে উদ্যোক্তারা

গ্রামাঞ্চলে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং
রাজশাহী, মেহেরপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলার গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, অনেক এলাকায় ৩০ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে। শহরে তুলনামূলক কম লোডশেডিং হলেও পৌর এলাকার বাইরে পরিস্থিতি বেশি খারাপ।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থী, কৃষক থেকে শুরু করে চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।

রাজধানীর সাভার এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে তীব্র লোডশেডিং চলছে। এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় এক কোচিং সেন্টারের কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে একাডেমিক কার্যক্রম ঠিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের অন্ধকারে বসে থাকতে হচ্ছে, যা মানসিক ও শারীরিকভাবে তাদের প্রভাবিত করছে।
সাভারের এক এসএসসি পরীক্ষার্থী রাতুল আহমেদ বলেন, রাতে পড়তে বসলে বারবার কারেন্ট চলে যায়। পরীক্ষার আগে এই সময়টা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

পটুয়াখালী জেলার বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে ভোগান্তির কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দা তারিক মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ। তিনি বলেন, শহরে তুলনামূলক লোডশেডিং কম থাকলেও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, পাশাপাশি কৃষি, উৎপাদন ও শিক্ষাক্ষেত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার একটি বিদেশি কোম্পানির কর্মকর্তা নুরুন্নবী বিন মোস্তফা বলেন, গতকাল রাত ১টায় বিদ্যুৎ গেছে, সকালে এসেছে। প্রতিদিনই এক থেকে দুই ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে। রাতে ঘুমানো খুব কষ্টকর হয়ে যায়। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, কখনো কখনো এক থেকে দেড় দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, কোথাও কোথাও দিনে গড়ে ৪ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই সময় আরও বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও শিক্ষার্থীদের ওপর।

ফলে তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে জনজীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

loadshading-2

লোডশেডিংয়ের চিত্র:
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। পিক আওয়ারে এই ঘাটতি আরও বেড়ে প্রায় ১৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিপিডিবি ও ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত কয়েক দিন ধরেই জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য মাত্রার লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। ১৬ এপ্রিল মোট উৎপাদনের বিপরীতে সারা দেশে ১৪৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৩৬০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে খুলনায় ৩১৯ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ২১০ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১৯৫ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে ১২০ মেগাওয়াট, বরিশালে ৯৫ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ৮০ মেগাওয়াট, রংপুরে ৭৮ মেগাওয়াট এবং সিলেটে ২৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। সার্বিকভাবে ঢাকার বাইরে ওই দিন মোট ১১২২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ এপ্রিল দিনের শুরু থেকেই বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল উল্লেখযোগ্য। সকাল ৬টায় চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪০১ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ৫৯৬ মেগাওয়াট। ফলে সে সময় ৮০৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। সকাল ৭টায় ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১২৫৫ মেগাওয়াট। সকাল ৮টায় তা কমে ৬৪৩ মেগাওয়াটে নামলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার ওঠানামা করে। সকাল ৯টায় ৩৬০ মেগাওয়াট, ১০টায় ২০৯ মেগাওয়াট, ১১টায় ৬৭৯ মেগাওয়াট এবং দুপুর ১২টায় তা বেড়ে ১১০৬ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। দুপুর ১টায় ১০৩৬ মেগাওয়াট, ২টায় ৮৪৪ মেগাওয়াট এবং বিকেল ৩টায় ৫৬২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। বিকেল ৪টায় ঘাটতি কিছুটা কমে ১৬৮ মেগাওয়াটে নামলেও সন্ধ্যার দিকে আবার তা অব্যাহত থাকে। বিকেল ৫টায় ১২৭ মেগাওয়াট, সন্ধ্যা ৬টায় ১১৮ মেগাওয়াট, ৭টায় ১২৮ মেগাওয়াট এবং রাত ৮টায় ১৪২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। রাত ৯টায় ৭৪ মেগাওয়াট থাকলেও ১০টায় আবার বেড়ে ১৪১ মেগাওয়াট হয়। রাত ১১টায় ৪৫১ মেগাওয়াট, রাত ১২টায় ৭৩৩ মেগাওয়াট, রাত ১টায় ৮১৪ মেগাওয়াট, রাত ২টায় ৮৯৮ মেগাওয়াট, রাত ৩টায় ৯৫৩ মেগাওয়াট, রাত ৪টায় ৯১৪ মেগাওয়াট এবং ভোর ৫টায় ৬৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়।

এদিকে ২০ এপ্রিলের হিসাব অনুযায়ী বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ১৪ হাজার ৩১ মেগাওয়াট। ফলে ওই দিনও ১২১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থেকে যায়, যা দেশের চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতির ধারাবাহিকতাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীদের জীবন
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া লোডশেডিংয়ে জনজীবনে নতুন করে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। দিনের পাশাপাশি রাতের সময়ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হওয়ায় পরীক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনায় ব্যাঘাতের মুখে পড়ছে।

আরও পড়ুন: দিনে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং, পরীক্ষার্থীরা করছে হায় হায়: সংসদে এমপি আইউবী

রাজধানীর মিরপুর এলাকার এসএসসি পরীক্ষার্থী রায়হানা জানায়, পরীক্ষার আগে শেষ সময়টায় রাতে বেশি পড়াশোনা করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে পড়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকার পরীক্ষার্থী সাব্বির মাহমুদ বলেন, দিনে কোচিং ও পরীক্ষার প্রস্তুতির কারণে রাতে পড়তে হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক সময় আলো ছাড়াই বসে থাকতে হচ্ছে। এতে মানসিক চাপ বাড়ছে।

মোহাম্মদপুর এলাকার এক শিক্ষার্থী জানায়, পরীক্ষার আগে এমন পরিস্থিতি খুবই অস্বস্তিকর। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে ঠিকমতো রুটিন মেনে পড়াশোনা করা যাচ্ছে না। পরীক্ষার সময় যেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়—এমন প্রত্যাশা তার।

বিদ্যুৎ-ডিজেল সংকটে বন্ধ হাজারো সেচপাম্প
একদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি, অন্যদিকে ডিজেল সংকটে দেশের বিভিন্ন জেলায় বোরো ধান চাষে বড় ধরনের হুমকি তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারের পাশাপাশি ফরিদপুর, জামালপুরসহ একাধিক জেলায় ডিজেল সংকটে হাজারো সেচপাম্প বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে মাঠে সময়মতো পানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় লক্ষাধিক হেক্টর জমির ফসল ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, অনেক এলাকায় সেচনির্ভর বোরো আবাদ পুরোপুরি ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাজারে ডিজেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি পাচ্ছেন না।

আরও পড়ুন: বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটির প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে!

জ্বালানি সংকটে বন্ধ ১৮ কেন্দ্র, ৩৫টি আংশিক উৎপাদনে
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৮৮ শতাংশই এসব জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তবে চলমান জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে, পাশাপাশি আরও ৩৫টি কেন্দ্র আংশিক সক্ষমতায় উৎপাদন করছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ১০টি এবং তেলভিত্তিক ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন কমে গেছে আরও ৩৫টি কেন্দ্রের, যার মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি এবং কয়লাভিত্তিক ২টি কেন্দ্র রয়েছে।

বন্ধ থাকা ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে
গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র: ঘোড়াশাল রিপাওয়ারড ইউনিট-৪, ঘোড়াশাল টিপিপি ইউনিট-৫, ঘোড়াশাল ৩৬৫ মেগাওয়াট, ঘোড়াশাল ১০৮ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ৩৩৫ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ৫৮৩ মেগাওয়াট, জেরা মেঘনাঘাট ৭১৮ মেগাওয়াট, বাঘাবাড়ী ৭১ মেগাওয়াট এবং সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র।

তেলভিত্তিক কেন্দ্র: গাগনগর ১০২ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ১০৪ মেগাওয়াট, জুলদাহ ১০০ মেগাওয়াট, জুলদাহ-২ ইউনিট ১০০ মেগাওয়াট, জঙ্গলিয়া ৫২ মেগাওয়াট, ফেনী লঙ্কা পাওয়ার, রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট এবং নাটোর ৫২ মেগাওয়াট কেন্দ্র।

জ্বালানি সরবরাহ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এসব কেন্দ্র নিয়মিতভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে গিয়ে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বকেয়া পরিশোধের চাপ, জ্বালানি তেলের সংকটসহ বিভিন্ন কারণে চলতি গরমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েলের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানির সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, সংকটের সময় সরকারের কথাবার্তা ও কার্যক্রমে মানুষের মধ্যে স্বস্তি, আস্থা ও আশার প্রতিফলন থাকা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, সরকার চাইলে শুরুতেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মুনাফামুক্ত নীতি নিতে পারত, যেখানে শুধু কস্ট প্রাইসে প্রয়োজনীয় ব্যয় অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করে জনগণের কাছ থেকে আদায় করা হতো।

তিনি আরও বলেন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত নির্ভরতা আমদানির ওপর চলে যাওয়ায় এক ধরনের বেসরকারি ও আমদানিনির্ভর কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে বড় একটি গোষ্ঠী অতিরিক্ত মুনাফা করছে। এর ফলে ব্যয় বেড়ে গিয়ে এখন সরকার আর্থিক চাপে পড়েছে এবং জনগণও এর ভোগান্তি বহন করছে।

এমআর/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর