নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৭ এএম
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি যখন দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী, ঠিক সেই সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে সরকার। সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের মাত্র দেড় মাসেই ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে ৪০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা, যা অর্থনীতিতে নতুন করে চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৮ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। তবে ৩১ মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল অঙ্কের নতুন ঋণ যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এসেছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এবং ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের এই বাড়তি ঋণগ্রহণ বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহে চাপ তৈরি করতে পারে। যদিও বর্তমান ব্যবসা পরিস্থিতি দুর্বল থাকায় তাৎক্ষণিক প্রভাব কম হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে বলছে, চলতি অর্থবছরের নয় মাসেই ব্যাংক ঋণের পরিমাণ পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা, সেখানে মার্চের শেষেই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৫১ কোটি টাকায়। পরবর্তীতে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের চাপ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে এই খাতে গতি ফিরছে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো নয়। তাই এখনই বড় চাপ নাও পড়তে পারে। তবে সরকার যদি ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে তা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।’
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট রয়েছে। খেলাপি ঋণসংক্রান্ত কঠোর নীতির কারণে অনেক ব্যবসায়ী ঋণ পাচ্ছেন না। পাশাপাশি প্রায় অর্ধেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে থাকায় তারা নতুন বিনিয়োগে যেতে পারছে না।’
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগামী জুন পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজস্ব আয়ের বড় ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ঋণ ফাঁদ এড়ানো। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণ নেওয়া অনিবার্য হলেও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
অন্যদিকে প্রতিনিয়তই লাগামহীন বাড়ছে দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রেখে যাওয়া ২০.৬৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ হু-হু করে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার (১১ হাজার ৩৫১ কোটি ডলার), যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে মাথাপিছু বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৯,৪৬৩ টাকা। যা বর্তমানে দেশের মোট রিজার্ভের তিন গুনেরও বেশি। বিদেশি ঋণের এই অর্থ বাংলাদেশের প্রায় দুইটি বাজেটের সমান।
বর্তমানে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ রয়েছে ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার, যা টাকায় প্রায় সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা। এছাড়া সঞ্চয়পত্রে রয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকসহ অন্যান্য দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। এই বিপুল ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধেই সরকারের ব্যয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে।
টিএই