মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২৫ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম
- বাইকারদের কেউ কেউ তেল নিয়ে বাসায় মজুত করছেন
- পাম্পে আগে দিনে চাহিদা ৭০০ লিটার থাকলেও এখন কয়েক হাজার
- তেল পাচ্ছে প্রতিটি গাড়ি-মোটরসাইকেল
- তেল নিয়ে ছড়ানো হচ্ছে নানা গুজব
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সারাবিশ্বে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। বাংলাদেশেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে দেশে চাহিদার তুলনায় বেশি তেল নেওয়ার কারণে সংকট চরমে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, তেল পর্যাপ্ত থাকলেও একটি চক্র সরকারের ঘোষণাকে পুঁজি করে সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। যেখানে একটি তেল পাম্পের অকটেনের চাহিদা প্রতিদিন হাজার লিটার, সেখানে তারা নিচ্ছে কয়েক হাজার লিটার। এই তেলের অধিকাংশ নিচ্ছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকেরা। তারা ট্যাংকি পূর্ণ করে বাসায় বা অন্য কোথাও নিয়ে তা মজুত করছেন। ফলে তেল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পসংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই জ্বালানি তেল পেতে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন ধরা শুরু হয়। মাঝখানে সেই লাইন কিছুটা কমেছিল। লোকজন চাপ কমালে লাইনে ভাটা পড়ে। তখন অনেকেই পর্যাপ্ত তেল নিয়েছেন। কিন্তু গত দুই দিন ধরে আবারও দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অথচ প্রতিটি মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের ট্যাংকি ভরে তেল দেওয়া হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, এত তেল যাচ্ছে কোথায়।

গাবতলীর একটি পাম্পের মালিক জানিয়েছেন, তাঁর প্রতিদিনের চাহিদা ৭০০ লিটার। কিন্তু এখন প্রতিদিন আনছেন ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার। তাঁর চাহিদার বাইরে এত তেল কারা নিচ্ছেন, সেটাই তাঁর প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, এই তেলের অধিকাংশই প্রাইভেটকার ও বাইকাররা নিয়ে যাচ্ছেন। তারা এসব তেল বাসায় মজুদ করছেন। ফলে তাঁকে প্রতিদিন চাহিদার কয়েক গুণ বেশি তেল আনতে হচ্ছে এবং তা নিমিষেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
শাহআলী ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা গতকাল বিকেল চারটায় সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন এনেছিল। কিন্তু সেই তেল রাত নয়টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। তাদের প্রতি মাসে চাহিদা ৯ থেকে ১১ হাজার লিটার হলেও গেল মাসে তারা কিনেছে ৩৩ হাজার লিটার অকটেন। এত তেল কারা নিচ্ছে এবং কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা।
এখন প্রতিদিন কত তেল বিক্রি হচ্ছে, তার একটি ধারণা দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।
আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সম্ভাব্য করণীয়
তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের ১ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ টন। এতে চলতি মাসে প্রথম ২৩ দিনে গড়ে প্রতিদিন অকটেন বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন। গতকাল ২৪ মার্চ করপোরেশনে অকটেনের মজুত ছিল প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টন। সেখান থেকে ডেডস্টক হিসেবে ১০ শতাংশ বা ১ হাজার ২৫০ টন বাদ দিলে সরবরাহযোগ্য মজুত থাকে ১১ হাজার ২৫০ টন। চলতি মাসের গড় ব্যবহার অনুযায়ী এই মজুত নয় দিনেরও কম সময় চলবে।
গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে লোকজনকে
ইতিমধ্যে গুজব ছড়ানো শুরু হয়েছে। সোমবার ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। ফলে যেকোনো সময় ফিলিং স্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এরপর থেকেই গুজব ছড়াতে থাকে। অনেকে একযোগে পাম্পগুলোতে ছুটছেন। কেউ কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বাইকার ও প্রাইভেটকার চালকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছেন।
বুধবার শাহবাগের একটি ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা এক যুবক বলেন, ফেসবুকে দেখেছি তেলের পাম্প যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এখানে এসে দেখছি লম্বা লাইন থাকলেও তেল দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কাছে বিষয়টি গুজব বলেই মনে হয়েছে।

তেল পর্যাপ্ত আছে, সংকট নেই
আসাদ গেটের বিপরীত পাশে থাকা তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার ফাত্তাহ আযম বলেন, চারটার আগে তেল দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ তাদের গাড়ি এখনো ডিপোতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তেল এলে সরবরাহ দেওয়া হবে। কোনো সংকট নেই। একই কথা জানিয়েছেন রাজধানীর অন্যান্য পাম্পসংশ্লিষ্টরাও। তারা বলছেন, বাইকার ও প্রাইভেটকার চালকেরা বেশি তেল নেওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তেল পাম্পের কর্মচারীরা আতঙ্কে
ঈদের পর ঢাকার মিরপুরের কয়েকটি পাম্পে তেল দিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন কর্মচারীরা। ফলে তারা এখন আতঙ্কে রয়েছেন। শাহআলী ফিলিং স্টেশনের এক কর্মী জানান, তারাও ভয়ে আছেন কখন কেউ হামলা করে বসেন। গত দুই দিনে আশপাশের কয়েকটি ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা হামলার শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ অকটেন বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। কোনো পাম্পে হামলা হলে তা সামাল দেওয়ার মতো পরিস্থিতি পুলিশের নেই—এমন আশঙ্কায় অনেকে তেল বিক্রি না করে পাম্প বন্ধ রাখছেন বলেও জানা গেছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় তেল দিতে সামান্য দেরি হলেই কর্মচারীদের মারধর ও লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটছে। তেল দিতে দেরি হলেই কেউ কেউ হট্টগোল করছেন। গত ২০ মার্চ রাতে বাগেরহাট শহরের খানজাহান আলী ফিলিং স্টেশনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে এর প্রতিবাদে পরদিন বিকেলে ফিলিং স্টেশনের সামনে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাম্প বন্ধসংক্রান্ত বিশেষ বিজ্ঞপ্তি টানিয়ে দেওয়া হয়। যদিও পরে এ ঘটনায় স্থানীয় যুবদলের নেতা সুমন পাইককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি বাগেরহাট পৌর যুবদলের আহ্বায়ক।

ভুক্তভোগীরা যা বলছেন
ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে প্রথম কর্মদিবস। এদিন থেকেই রাজধানীর তেল পাম্পগুলোতে আবার দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সকাল থেকে লাইন দীর্ঘ থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা কমেছে। পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের ট্যাংকি পূর্ণ করেই তেল দেওয়া হচ্ছে। এরপরও কেন দীর্ঘ লাইন হচ্ছে, তা খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, যারা মাসে তিন বা চার দিন তেল নেন তারা কোনো সমস্যা তৈরি করছেন না। সমস্যা তৈরি করছেন রাইডশেয়ার চালকদের একটি অংশ। তারা তেল নিয়ে রাইড দেওয়ার পর বাড়তি তেল বাসায় মজুদ করছেন।
বুধবার দুপুরে বিজয়স্মরণী মোড়ে থাকা ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে তেল নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন রাসেদ আহমেদ। তাঁর লাইনের সিরিয়াল ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গেটের সামনে। কখন পাম্পে পৌঁছাবেন, তা তিনি জানতেন না। পাম্পটির সামনে থাকা খালিদ সাইফুল্লাহ জানান, তিনি সকাল আটটায় এসেছেন তেল নিতে। দুপুর দেড়টা পর্যন্তও তেল পাননি।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, রেশনিং পদ্ধতিতে তারা ভালোভাবে তেল পেয়েছেন। তখন সবাই তেল পেতেন। কিন্তু এখন ট্যাংকি ভরে তেল দেওয়ায় কয়েক শ মানুষকেই তেল দিয়ে মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পরদিন আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানি তেলের অপেক্ষা, আজও দীর্ঘ লাইন
কেউ কেউ তেল মজুদ করছেন
মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় সংসদের পশ্চিম পাশের ফুটপাথে বসে ছিলেন এক ব্যক্তি। গায়ে রেইনকোট, পাশে দুটি বড় জারকিন। প্রতিটিতে অন্তত পাঁচ লিটারের বেশি তেল ধরবে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেগুলো তেল। বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছেন। তারা খাগড়াছড়ি যাবেন। পথে তেলের সংকট হতে পারে, তাই বেশি তেল নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তাঁর বন্ধু তখন আসাদ গেটের বিপরীত পাশে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
এমন চিত্র অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ মোটরবাইকার দিনে কয়েক দফায় তেল নিয়ে আবার পাম্পে আসছেন। কেউ কেউ বাসায় বড় ড্রামে তেল মজুদ করছেন। পরে সেই তেল ব্যবহার করছেন, কেউ আবার বিক্রিও করছেন। গত কয়েক দিনে পর্যাপ্ত সরবরাহের সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র তেল কিনে মজুদ করেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ভাসমানভাবে তেল বিক্রি করা ব্যক্তিরা এতে জড়িত।

সরেজমিন যা পাওয়া গেল
বুধবার গাবতলী থেকে শাহবাগ পর্যন্ত বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, অনেক পাম্প বন্ধ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অকটেন নেই। বিকেলে তেল এলে সরবরাহ দেওয়া হবে। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে শাহবাগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিপরীত পাশে থাকা একটি পাম্পে। সেখানে দীর্ঘ লাইন থাকলেও সকাল থেকেই তেল দেওয়া হচ্ছিল।
পাম্পের কর্মচারীরা জানান, যেমন প্রাইভেটকার ও বাইকাররা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছেন, তেমনি তাদেরও ডিপোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রাকে করে তেল আনতে হচ্ছে। আবার চাহিদার তুলনায় কম তেলও পাচ্ছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কো-কনভেনর মিজানুর রহমান রতন বলেন, কাগজে-কলমে রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও বাস্তবে সরবরাহ এখনো সীমিত। এতে সাধারণ মানুষ ও পাম্প মালিক—উভয়ই ভোগান্তিতে পড়ছেন।
অন্যদিকে পাম্প মালিকদের আরেক অংশের সভাপতি নাজমুল হক জানান, দীর্ঘদিন রেশনিং চালু থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। হঠাৎ করে তা স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এমআইকে/এআর