আব্দুল হাকিম
১৫ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম
ঈদ এলেই নতুন নোটের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়। ছোটদের সালামি দেওয়া, প্রিয়জনকে উপহার কিংবা ঈদের আনন্দে নতুন টাকার খসখসে গন্ধ হাতে নেওয়ার আলাদা এক অনুভূতি রয়েছে। তাই ঈদ ঘনিয়ে এলে অনেকেই ব্যাংকে গিয়ে নতুন নোট সংগ্রহের চেষ্টা করেন। তবে এবার বিভিন্ন ব্যাংকে ঘুরেও নতুন নোট পাচ্ছেন না ভোক্তারা। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ভিড় করছেন রাজধানীর গুলিস্তানের ফুটপাতে, যেখানে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে নতুন নোটের বান্ডিল। তবে সেই নোট পেতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। প্রতি হাজার টাকার নতুন নোট কিনতে অতিরিক্ত তিনশ থেকে চারশ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের আশপাশ ও গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেটের সামনের ফুটপাতে নতুন নোট বিক্রির এই বাজার বেশ কয়েক বছর ধরেই চলে আসছে। নতুন নোট পণ্য হিসেবে বিক্রি করা বেআইনি হলেও প্রতি ঈদের সময়ই সেখানে জমে ওঠে এমন বেচাকেনা। এই দুই এলাকায় ৮০টির বেশি অস্থায়ী দোকানে নতুন নোট ও ছেঁড়া টাকার লেনদেন চলছে। এবার দুই টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত নতুন নোটের বান্ডিল কিনতে ক্রেতাদের অতিরিক্ত ২৫০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
এবার ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাধারণ নাগরিকদের জন্য নতুন নোট ছাড়েনি বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নির্দিষ্ট পরিমাণ নতুন নোট সংগ্রহ করতে পারবেন। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য নতুন নোটের সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা না ছাড়লে এরা টাকা কীভাবে পাচ্ছে?
নতুন নোট কিনতে আসা ক্রেতারা বলছেন, ব্যাংকে গিয়েও তারা নতুন নোট পাননি। নতুন নোটের ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক দিন ধরেই বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা বেড়েছে। এবার আগেভাগে ছুটি শুরু হওয়ায় অনেকে গ্রামে যাওয়ার আগে নতুন নোট সংগ্রহ করতে আসছেন।

রোববার (১৫ মার্চ) সকালে গুলিস্তান ও মতিঝিল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাতের বিভিন্ন স্থানে ছোট টেবিল বা পলিথিনের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে নতুন নোটের বান্ডিল। দশ, বিশ, পঞ্চাশ ও একশ টাকার নোট বেশি দেখা যায়। ক্রেতারা এসে দরদাম করছেন, কেউ কিনে চলে যাচ্ছেন আবার কেউ দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন। তবে এই ব্যবসা নিয়ে কথা বলতে গেলে বেশির ভাগ বিক্রেতাই অনাগ্রহ দেখান। কেউ মুখ ঘুরিয়ে নেন, কেউ হাত তুলে অনুরোধ করেন যেন ছবি না তোলা হয়।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পুরোনো নকশার দুই টাকার নতুন এক বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়তি দামে। ১০ টাকার পুরোনো নকশার নোট বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে, আর নতুন নকশার নোটে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। ২০ টাকার নতুন নকশার নোটের বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বেশি দামে এবং পুরোনো নকশার বান্ডিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দামে।
এছাড়া ৫০ টাকার পুরোনো নকশার নোট বান্ডিলপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। নতুন নকশার নোটের ক্ষেত্রে বাড়তি দিতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ১০০ টাকার নতুন ও পুরোনো নকশার বান্ডিলের ক্ষেত্রে বাড়তি দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। ২০০, ৫০০ ও এক হাজার টাকার নোটের বান্ডিলের ক্ষেত্রেও বিক্রেতাভেদে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। দরদাম করলে অনেক সময় বান্ডিলপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কমানোও দেখা গেছে।
নতুন এই নোট কিনতে আসা ক্রেতারা বাড়তি দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ব্যাংকে না পাওয়ার কারণেই এখানে আসতে হচ্ছে বলে জানান তারা।

বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল ইসলাম জানান, ২০ টাকার নতুন নোটের এক বান্ডিল কিনতে তাকে বাড়তি ৩৫০ টাকা দিতে হয়েছে। ঈদে পরিবারের সঙ্গে পাবনার সাঁথিয়ায় যাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, বাড়ির ছোট ভাই ও শিশুদের জন্যই মূলত এই নতুন নোট নেওয়া।
আরেকজন ক্রেতা বলেন, ছোটবেলায় ঈদের আগে নতুন টাকা পাওয়া নিয়ে আলাদা আনন্দ ছিল। এখন ব্যাংকে গেলে নতুন নোট পাওয়া যায় না, আর ফুটপাতে এলে বেশি দাম দিতে হয়। তবু প্রয়োজনের কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে কিনছেন।
নতুন নোট কিনতে গুলিস্তানে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী দুই বন্ধু মুন্তাসির ও আবু সাঈদ জানান, গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আগে ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোট নিতে এসেছেন। কিন্তু বান্ডিলপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম চাওয়া হচ্ছে।
মাশরুর হাসান নামের এক ক্রেতা বলেন, ঈদ সামনে থাকায় ছোটদের খুশির জন্য নতুন নোট নেওয়া দরকার হয়। কিন্তু ব্যাংকে না পেয়ে বাধ্য হয়ে এখানে এসে কিনতে হচ্ছে। এখানে এসে দেখা যায়, হাজার টাকার জন্য তিনশ বা চারশ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ঠিকভাবে নতুন নোট সরবরাহ করলে মানুষকে ফুটপাতে এসে কিনতে হতো না। প্রায় সব জায়গায় একই দাম চাওয়া হচ্ছে। মনে হয় এখানে কোনো ধরনের সমন্বয় আছে।
মতিউর রহমান নামের এক বিক্রেতা জানান, এখন দাম কিছুটা কম থাকলেও কয়েক দিনের মধ্যে চাহিদা বাড়লে দাম আরও বাড়তে পারে। কারণ এবার বাজারে নতুন নোট তুলনামূলক কম এসেছে। তবে জুলাইয়ের গ্রাফিতি (July Graffiti) সংবলিত ১০ টাকার নোটের বিশেষ চাহিদার কারণে দাম বেড়েছে।
তবে এই ব্যবসা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকে ভয় পান। এক বিক্রেতা হাত তুলে অনুরোধ করে বলেন, ছবি না তুলতে এবং বেশি প্রশ্ন না করতে। তার জানান, তারা ফুটপাতে বসে টাকা বিক্রি করেন, তাই ছবি তোলা বা বেশি প্রশ্ন করলে পুলিশ এসে ঝামেলা করতে পারে।
আরেক বিক্রেতা বলেন, অনেক সময় তাদেরও বেশি দামে নতুন নোট কিনে আনতে হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে জোগাড় করে আনতে হয় বলে বিক্রির সময় কিছুটা বেশি দাম রাখতে হয়। মানুষের ধারণা, তারা অনেক লাভ করেন, কিন্তু বাস্তবে ঝুঁকি নিয়েই এই ব্যবসা করতে হয়।

এই পরিস্থিতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদেরও উদ্বেগ রয়েছে। তারা মনে করেন, বাজারে নতুন নোটের এমন অঘোষিত বেচাকেনা মূলত সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতারই ইঙ্গিত দেয়। তারা বলেন, ঈদের সময় নতুন নোটের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। সেই চাহিদা ব্যাংকিংব্যবস্থার মাধ্যমে পূরণ করা না হলে বিকল্প বাজার তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মানুষের মধ্যে নতুন নোট ব্যবহারের একটি সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পরিকল্পিতভাবে বেশি পরিমাণ নতুন নোট বাজারে ছাড়লে এবং সহজভাবে মানুষের মধ্যে বিতরণ করলে এই ধরনের ফুটপাতের বাজার অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোও জরুরি, যাতে কেউ ব্যাংক থেকে নতুন নোট সংগ্রহ করে পরে বাড়তি দামে বিক্রি করতে না পারে।
গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, বাংলাদেশে ঈদকে কেন্দ্র করে নতুন টাকার প্রতি মানুষের একটি আলাদা আবেগ কাজ করে। ঈদ যেহেতু একটি বড় উৎসব, তাই এই উৎসবকে আরও আনন্দমুখর করে তুলতে অনেকেই নতুন টাকা সংগ্রহ করতে চান। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে নতুন টাকা প্রকাশ্যে কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে, অথচ ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য তা দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে শোনা যাচ্ছে, প্রায় দেড় লাখ টাকার নতুন নোট বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষ এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিষয়টি হয়ত খুব বড় কোনো অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, কিন্তু এখানে সাধারণ মানুষের বিষয় জড়িত, তাই এটি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, নতুন নোট কালোবাজারে বিক্রির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ কয়েক দিন আগে সেখানে একটি অভিযান চালানোর সময় বিক্রেতারা জানিয়েছেন, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের এলাকা থেকেই নতুন নোট সংগ্রহ করেন। যদি সত্যিই সেখান থেকেই নোট সংগ্রহ করা হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো মাধ্যমে তা পাওয়া হচ্ছে এবং সেখানে ভেতরের কারও যোগসাজস থাকার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা দরকার। সরকার যদি এই বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাকে ঘিরে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাই তিনি হয়তো শুরুতেই নতুন কোনো ঝামেলা বা বিতর্কে জড়াতে চাইছেন না। সম্ভবত পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার পর তিনি এসব বিষয়ে কাজ করতে চাইছেন।

এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, এখানে মূল দুর্বলতার জায়গা হচ্ছে দুর্নীতি। তাই বিষয়টি অবশ্যই তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকেই এ ধরনের বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে অন্য ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন আর্থিক ঘটনায় অনিয়মের বিষয় সামনে এসেছে। এসব ঘটনার পেছনে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যক্তিস্বার্থে নীতির অপব্যবহার করছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বিষয়টি শক্তভাবে তদন্ত করা এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বাজারে নতুন নোট পণ্য হিসেবে বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা যদি এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িত থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুখপাত্র বলেন, প্রতিটি উৎসবে নতুন নোটের চাহিদা থাকে। তবে নতুন নোটের আকাঙ্ক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ আমরা ক্যাশলেস বাংলাদেশের দিকে যাচ্ছি। নতুন নোট কোনো পণ্য নয়, যে তা বিক্রি হবে। নতুন পণ্য হিসেবে বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কেউ যদি এ ধরনের কাজে জড়িত থাকেন তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে যদি নতুন নোট বিক্রির জন্য সরবরাহ করা হয় তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এএইচ/জেবি