আব্দুল হাকিম
১৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম
# চার মাস ধরে উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রি
# ঋণের বোঝায় অনেক খামার বন্ধের পথে
# করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যের শঙ্কা
# প্রান্তিক খামারির জন্য আলাদা বিক্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন
# পোল্ট্রি খাতের টেকসই উন্নয়নে সরকারি সহায়তা জরুরি
উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ডিমের দাম কম থাকায় লোকসানে পড়েছেন দেশের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা। টানা চার মাস ধরে ক্ষতির মুখে পড়ে অনেকেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত। বিদ্যুতের বকেয়া বিল এবং ঋণ মিলিয়ে অনেকে খামার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
খামারিরা বলছেন, তাদের জন্য আলাদা বিক্রয়কেন্দ্র তৈরি করা জরুরি, যাতে তারা বড় করপোরেট খামারিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন। এছাড়া খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, বিদ্যুতের ভর্তুকি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা। ন্যায্যমূল্য না দেওয়া হলে প্রান্তিক খামারিরা ঝরে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে খামারি থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত।
খামারিরা জানাচ্ছেন, অনেকেই ইতোমধ্যেই দেউলিয়া হয়ে খামার বন্ধ করেছেন। কেউ দেশের বাইরে পাড়ি জমিয়েছেন, আবার কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রান্তিক খামারিদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে খামার পরিচালনা করছেন, তাদের চোখে-মুখে হতাশা কাজ করছে। একের পর এক খামার বন্ধ হলে দেশের ডিম সরবরাহে ঘাটতির শঙ্কা রয়েছে।
তারা বলছেন, ছোট খামারিরা না টিকে থাকলে পুরো পোল্ট্রি শিল্প কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এতে শুধু খামারি নয়, ভোক্তারা ও দেশের প্রোটিন সরবরাহ ব্যবস্থা বিপন্ন হবে।
পোল্ট্রি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের বাজার অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেট এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্প এখন বড় সংকটে। প্রান্তিক খামারিরা ঝরে পড়লে পুরো খাত কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে। তখন বাজারে ডিম ও মুরগির দাম তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর ভোক্তারা বাধ্য হয়ে উচ্চমূল্যে পণ্য কিনতে হবে।
টাঙ্গাইল জেলা আগে ‘ডিমের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কয়েক বছর আগেও গ্রামের প্রতিটি খামার মুরগির কোলাহল এবং খামারিদের ব্যস্ততা নিয়ে মুখর ছিল। খামারকেন্দ্রিক এই কর্মপরিবেশে হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেত। এখন সেই প্রাণশক্তি নেই। অনেক খামার আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ, যারা টিকে আছেন তাদের অবস্থাও দমবন্ধের মতো। খামারিরা বলছেন, ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে এবং খামার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠেছে।
ভূঞাপুরের প্রান্তিক খামারি খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গত সোমবার আমি ডিম বিক্রি করেছি সাড়ে ৬ টাকায়। অথচ প্রতিটি ডিম উৎপাদনে খরচ হয়েছে সাড়ে ৯ টাকা। চার মাস ধরে লসে ডিম বিক্রি করছি। এখন এই লোকসান বহন করার মতো আর শক্তি নেই।’
তার মতো আরও অনেক খামারি দৈনন্দিন উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। ২৪ বছর ধরে খামার পরিচালনা করা আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমার খামারে প্রতিদিন ৪০ হাজার টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। মাসে লোকসান ৪ লাখ টাকার ওপরে। তিন মাস ধরে বিদ্যুৎ বিল দিতে পারিনি-১ লাখ ২০ হাজার টাকা বাকি। এখন ডিম বিক্রি করে মুরগির খাবারের খরচও ওঠে না। এর ফলে খামার চালানো প্রায় অসম্ভব।’
একই এলাকার আলম হোসেন বলেন, ‘আমার খামারে এখনো ২০ হাজার মুরগি আছে। বাজারে ডিমের দাম ৬ টাকার নিচে। দেড় মাসে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। সরকার যদি ডিমের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ না করে, তাহলে এই খাত ধ্বংস হয়ে যাবে।’
খামারি আবু হানিফ বলেন, ‘ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক খামারি ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে। কেউ দেশের বাইরে গেছে, কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদেরও একই পরিণতি হবে।’

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রান্তিক খামারিদের পরিশ্রমের কারণে দেশের মানুষ তুলনামূলক কম দামে ডিম ও মুরগি খেতে পেরেছে। অথচ আজ তাদেরই সবচেয়ে বেশি সংকট। যদি প্রান্তিক খামারিরা ঝরে পড়ে, গোটা শিল্প কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে। তখন বাজারে তাদের নির্ধারিত দামেই ভোক্তাদের ডিম ও মুরগি কিনতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, সরকারের উচিত প্রান্তিক খামারিদের জন্য বিশেষ নীতি গ্রহণ করা। কৃষক কার্ড বিতরণে অগ্রাধিকার, সহজ শর্তে ঋণ, বিদ্যুতের ভর্তুকি প্রদান এবং বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা বিক্রয়কেন্দ্র তৈরি করা প্রয়োজন।
বিপিআইএ সভাপতি মনে করেন, প্রান্তিক খামারিদের জন্য ভিন্ন পলিসি প্রণয়ন করা জরুরি। তারা যাতে করপোরেট খামারিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন, তাতে কোন ধরণের ট্যাক্স বা ভ্যাট আরোপ করা না হওয়া উচিত। তবে বড় করপোরেট খামারিদের জন্য ভিন্নভাবে কর ধার্য করা যেতে পারে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক ডা. এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, দেশে খামারের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। তবে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই-মোট কত খামার রয়েছে এবং এই খাতে কত মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে, তার নির্ভুল তথ্য নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সম্প্রতি অনুমোদিত পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা খাতের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, পোল্ট্রি খাত গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো না হলে ছোট খামারিরা দ্রুত ঝরে পড়বে।
মুস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে হলে বাজার সংস্কার, স্বল্প সুদে ঋণ এবং কৃষক কার্ড বিতরণে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। নইলে দেশের অন্যতম প্রধান প্রোটিন সরবরাহকারী এই শিল্প সংকটে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে খামারি থেকে শুরু করে ভোক্তা-সবার ওপর।
এএইচ/এমআর