images

অর্থনীতি / সারাদেশ

তেল ক্রয়ে হুড়াহুড়ি, লাগাম টানল বিপিসি

০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

  • ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন
  • ট্যাঙ্কি পূর্ণ করতে তেল কেনায় বাগবিতণ্ডা
  • ডিজেল আমদানি করা হলেও পেট্রোল-অকটেন দেশেই উৎপাদিত হয়, তাই সংকট হবে না-বিপিসি
  • ভিন্ন তথ্য ইআরএলের 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে এমন আশঙ্কায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল কেনার হিড়িক পড়েছে। নগরীর বেশ কিছু ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা যানবাহনের আধা কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।

অনেক চালক তাদের গাড়ির ট্যাঙ্কি পূর্ণ করে তেল মজুত করার চেষ্টা করছেন। এতে অতিরিক্ত চাপের কারণে কিছু ফিলিং স্টেশনে মজুত তেল দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তেল বিক্রয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

শুক্রবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে গাড়ির ধরণ অনুযায়ী তেল বিক্রয়ের নির্দেশনা জারি করে বিপিসি। নির্দেশনায় বলা হয়, একটি মোটরসাইকেল দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন কিনতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ি সর্বোচ্চ ১০ লিটার, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি) বা জিপ এবং মাইক্রোবাস প্রতিদিন ২০-২৫ লিটার পর্যন্ত তেল কিনতে পারবে।

পিকআপ বা লোকাল বাসের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭০-৮০ লিটার ডিজেল এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা কন্টেইনার ট্রাক প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২০০-২২০ লিটার জ্বালানি কিনতে পারবে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবের কারণে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ফিলিং স্টেশন থেকে তেল কেনার এই দৈনিক সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু নির্দেশনা জারির পর চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে শত শত মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। ক্রেতার চাপ সামলাতে হিমশিম খেয়ে কোনো কোনো পাম্প তেল বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।

নগরীর বায়েজিদ এলাকার বি আর সোনারগাঁও ফিলিং স্টেশনের শ্রমিক ইসমাইল জানান, যুদ্ধের কারণে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই তেল নিতে গাড়ির চাপ বাড়ে। বিপিসির নির্দেশনার পর শুক্রবার বিকেল থেকে চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত তেলের মজুত শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে তেল অর্ডার দেওয়া হয়েছে, সরবরাহ এলে আবার বিক্রি শুরু হবে।

একই কথা জানান নগরীর হাটহাজারী সড়কের পাঁচলাইশ থানাধীন আতুরার ডিপো এলাকার এম আই ভি সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনের শ্রমিক আরিফুল হক। তিনি বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে তেল নেওয়ার জন্য যানবাহনের চাপ ছিল অস্বাভাবিক। মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে অর্ডার দেওয়া হয়েছে।

শনিবার (৭ মার্চ) সকালে নগরীর গণি বেকারি মোড়ে অবস্থিত কিউ সি ট্রেডিং লিমিটেড ফিলিং স্টেশনে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে তেল নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহনের অন্তত আধা কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন ছিল।

আরও পড়ুন—

লাইনে দাঁড়ানো মোটরসাইকেল চালক গোলাম সরওয়ার বলেন, ‘টিভি-পত্রিকায় দেখেছি ইরান যুদ্ধের কারণে দেশে তেল আসছে না। যা আছে তাও দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিপিসি তেল কেনায় লাগাম টানায় বিষয়টি আরও জটিল মনে হচ্ছে। তেল থাকলে কেনা সীমিত করা হবে কেন? এ কারণেই ভিড় বাড়ছে।’

নুরুল ইসলাম নামে এক মাহিন্দ্রা চালক বলেন, ‘মুরাদপুর থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করি। বৃহস্পতিবার বিকেলে তেল কিনতে গিয়ে কয়েকটি পাম্পে 'তেল নেই' সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখেছি। এরপর থেকে নগরীর সব পাম্পেই দীর্ঘ লাইন। শুক্রবার বিকেল থেকে সাইনবোর্ড সরিয়ে নিলেও নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দিচ্ছে না।’

কিউ সি ট্রেডিং লিমিটেডের কর্মকর্তা মনির বলেন, ‘আমাদের কাছে তেলের সংকট নেই এবং দামও বাড়েনি। তবে তেল কেনায় সীমাবদ্ধতা আরোপের পর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। অনেক চালক ট্যাঙ্কি পূর্ণ করার জন্য বাগবিতণ্ডা করছেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসি নিয়ন্ত্রণাধীন তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীরুল হাসান বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তেল মজুত আছে, হুড়াহুড়ি করার প্রয়োজন নেই। আশা করছি সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশনা দেবে।’

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, ‘দেশের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে কখনও কখনও আমদানি কার্যক্রমে সাময়িক বাধা তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি মজুত নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রচারের ফলে গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। অনেক ডিলার ও গ্রাহক প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন, যা আমাদের নজরে এসেছে।’

আরও পড়ুন—

তিনি আরও জানান, ফিলিং স্টেশনগুলোকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে ক্রেতাদের রসিদ দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তীবার তেল নেওয়ার সময় সেই রসিদ দেখাতে হবে। ডিলাররা রসিদ যাচাই করে তেল সরবরাহ করবেন এবং মজুত ও বিক্রির তথ্য নিয়মিত ডিপোতে জানাবেন। বরাদ্দের অতিরিক্ত কোনো অবস্থাতেই সরবরাহ করা যাবে না।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিন ও জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুত আছে। চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী দুটি জাহাজ এসেছে এবং আরও জাহাজ আসার পথে রয়েছে। হরমোজ প্রণালীর উত্তেজনার কারণে সৌদি আরব থেকে দুটি জাহাজের আগমন কিছুটা বিলম্বিত হয়েছিল। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭টি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুতই দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত বাফার স্টক গড়ে উঠবে। এছাড়া ডিজেল আমদানি করা হলেও পেট্রোল-অকটেন দেশেই উৎপাদিত হয়, তাই সংকট হওয়ার কথা নয়।

তবে ভিন্ন তথ্য মিলেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) সূত্রে। সংস্থাটির তথ্যমতে, দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মজুত তুলনামূলক কমে এসেছে। ডিজেলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৬ লাখ ২৪ হাজার টনের মধ্যে ব্যবহারযোগ্য মজুত ১ লাখ ৮০ হাজার টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ বা প্রায় সাত দিনের সরবরাহ। অকটেনের মজুত ২৮ হাজার টন (মোট সক্ষমতার ৫৩ শতাংশ), যা প্রায় ১৪ দিনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম। পেট্রোলের মজুত ১৮ হাজার টন (মোট সক্ষমতার ৪৯ শতাংশ), যা প্রায় আট দিনের সরবরাহ সম্ভব।

ctg-2

ইআরএল কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পেট্রোল-অকটেন দেশেই উৎপাদিত হলেও তা বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই ক্রুড অয়েল সময়মতো দেশে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিনিধি/একেবি