আব্দুল হাকিম
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
রমজান শুরু হতে আর মাত্র একদিন বাকি। সিয়াম সাধনার এই মাসটি সাধারণত সংযম ও প্রশান্তির বার্তা নিয়ে আসে। তবে বাস্তবে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে বইছে অস্থিরতার হাওয়া। পর্যাপ্ত আমদানি এবং রেকর্ড পরিমাণ মজুত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ ভোক্তারা স্বস্তি পাচ্ছেন না। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে রমজান-সংক্রান্ত প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশের মশলার বাজারও অস্থির হয়ে উঠেছে। লেবু, দারুচিনি, এলাচ থেকে শুরু করে রসুন ও আদা—সব ধরনের মশলার দাম সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার তদারকির ঘাটতির সুযোগ নিয়েই এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে। ভোট উৎসব শেষ হওয়ার পর রমজানকে ঘিরে বাজারে অস্বস্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চিনি, ছোলা, ডাল—সবকিছুর দামও ঊর্ধ্বমুখী।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এনবিআর তথ্য অনুযায়ী, রোজার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে মটর ডাল ছাড়া ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও গমের আমদানি গতবারের তুলনায় বেড়েছে। খেজুরের আমদানি আড়াই শতাংশ কমলেও হিমাগারে গতবারের মজুত রয়েছে। অর্থাৎ মটর ডাল ছাড়া বাকি পণ্যের আমদানি বেড়েছে।
এনবিআর বলছে, চলতি অর্থবছরের শেষ চার মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চিনি, ৪৭ হাজার টন খেজুর, ২ লাখ ৫ হাজার টন মসুর ডাল, প্রায় ৪ লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং ১৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে। এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বাজারে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি ছোলা আমদানি হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, শুধু এই মাসে সয়াবিন তেলের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টন। একই সঙ্গে চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন, পেঁয়াজ ৫ লাখ টন, ছোলা ১ লাখ ৫০ থেকে ২ লাখ টন এবং খেজুর ৬০ থেকে ৮০ হাজার টনের মধ্যে রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার রোজার পণ্যের আমদানি শুরু হয় ডিসেম্বর থেকে। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি মাসে। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আন্দোলনের কারণে পণ্য খালাস ব্যাহত হয়। আবার লাইটার জাহাজের সংকটে খালাস হওয়া পণ্য কারখানায় পৌঁছাতে দেরি হয়। এতে কারখানায় রোজার পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে পাইকারি বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। তবে আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান শ্রমিক আন্দোলন। কারণ আমদানিনির্ভর পণ্যের বড় অংশ বন্দর দিয়ে দেশে আসে।
আমদানি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় ছোলার আমদানি বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। মুগ ডালের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশ। মসুর ৮৭ শতাংশ, খেজুর ২৩১ শতাংশ এবং চিনি ১১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীল দামের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমদানিকারকেরা আগেভাগেই চালান এনেছেন। ফলে রমজানের আগে বাজারে চাহিদা মেটাতে সমস্যা হয়নি।
রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার, মৌলভীবাজার ও বেগমবাজার এলাকায় সকাল থেকেই জমে উঠছে পাইকারি বাজার। রমজানকে সামনে রেখে এ সময়টাতে স্বাভাবিকভাবেই বেচাকেনা বেড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খেসারি ডাল ৮৫–৯০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকায় উঠেছে। দেশি রসুন ৯০–১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। আমদানি করা রসুন ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আদা ১৩০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। চিনির দাম প্রায় ১০০ টাকা কেজি। ছোলার বেসন ৮০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
আরও পড়ুন: রমজানের বাজারে বিগত সরকারের মতো আচরণ করব না: বাণিজ্যমন্ত্রী
ভালো মানের দারুচিনি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং এলাচ ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা বা তার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে এলাচ, জিরা ও লবঙ্গের দামও তুলনামূলক অনেক বেশি রয়েছে। ভারতসহ কয়েকটি দেশ থেকে আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মসলা দীর্ঘ পথ ঘুরে দেশে আসছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যা দামে প্রভাব ফেলছে। ভারতীয় এলাচ কেজিতে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত, ভারতীয় জিরা ৫৭০ টাকা, ইরানি ও আফগানি জিরা প্রায় ৭০০ টাকা এবং শ্রীলঙ্কার লবঙ্গ ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, একসঙ্গে কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ায় মাসিক বাজার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য রমজানের আগে এই বাড়তি চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ইফতার ও সেহরিতে ব্যবহৃত পণ্যের পরিমাণ সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি থাকে। ফলে সামান্য দাম বাড়লেও তার প্রভাব বড় হয়ে দেখা দেয়। তারা বলছেন, বাজার তদারকির ঘাটতির সুযোগ নিয়েই এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে। ভোট উৎসব শেষ হওয়ার পর রমজানকে ঘিরে বাজারে অস্বস্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চিনি, ছোলা, ডালসহ সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী।

কারওয়ান বাজার এলাকায় বাজার করতে আসা এক চাকরিজীবী আদনান বলেন, ডাল, তেল, পেঁয়াজ—সবকিছুর দাম একসঙ্গে বাড়ছে। বেতন তো বাড়ে না, কিন্তু খরচ বাড়তেই থাকে। রমজানে খরচ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। তার ওপর এই অতিরিক্ত দাম বাড়ার কারণে মাসিক বাজেটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনের খাবার, সেহরি ও ইফতারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামলানো এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মতিঝিলের একটি বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের আয় বেশি নয়, কিন্তু রমজানে বাজারের চাহিদা বেড়ে যায়। ডাল, তেল, চিনি, ভোজ্যতেল—সবকিছু আগের তুলনায় এখন অনেক দামি। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে আমাদের পরিবারের বাজেটের ওপর চাপ আরও বেড়ে গেছে। আগে যেখানে মাসের শেষে অতিরিক্ত খরচ সামলানো সহজ ছিল, এখন তা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের মতো গৃহস্থদের জন্য বাজারের এমন পরিস্থিতি চিন্তার বিষয়।
মিরপুর-৬ কাঁচাবাজার এলাকায় বসবাসকারী শিক্ষিকা রোকসানা আক্তার বলেন, আমি পরিবারসহ রমজানে বাজার করি। প্রতিদিনের খাবার, ইফতার ও সেহরির জন্য যে পণ্যগুলো প্রয়োজন, তার দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। পেঁয়াজ, রসুন, তেল—এই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর দাম বাড়ার কারণে আমাদের পরিবারকে এক ধরনের অতিরিক্ত চাপ নিতে হচ্ছে। খেজুর, ডাল, ছোলা—রমজানের আগে এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। আমাদের পরিবারকে প্রতিদিনের ইফতার ও সেহরির জন্য খরচের পরিকল্পনা করতে হয়। দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিনের বাজারের ব্যয় বাড়ছে। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য এটি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে, অন্য কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন: রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ খাদ্যে ১৫ দফা নাগরিক দাবি
ব্যবসায়ীদের মতে, বন্দর ধর্মঘটের কারণে সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়া এবং নির্বাচনের ছুটিতে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে তারা দাবি করেছেন, চাহিদার তুলনায় বাজারে পণ্যের মজুত যথেষ্ট রয়েছে। বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলে আমদানিকৃত ছোলা, ডাল, চিনি, তেল ও খেজুর বাজারে পৌঁছাতে দেরি হবে। নির্বাচন ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে কার্যদিবস কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
মিরপুর বাজারের ব্যবসায়ী নাজমুল হক বলেন, এমন সময়ে আমাদের ব্যবসা পরিচালনা করা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে। রমজান শুরুর আগে ক্রেতাদের চাহিদা বেড়ে যায়, আর সেই সঙ্গে পাইকারি বাজারে ডাল, তেল, চিনি ও ভোজ্যতেলের দামও বেড়ে গেছে। খুচরা বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ রাখা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াটা আরও কঠিন হয়ে গেছে। আমরা চাই বাজার স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল থাকুক, যাতে সাধারণ ক্রেতারা অতিরিক্ত খরচের চাপ না পান।
আমদানিকারকেরা জানান, জাহাজ ভিড়লেও খালাস প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে পণ্য গুদামে পৌঁছাতে দেরি হয়। ফলে পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে যায় এবং দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দরে অচলাবস্থা থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে পারে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও গুজব ছড়িয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হলে বাজার অস্থিতিশীল হতে সময় লাগে না। তাই নিয়মিত তদারকি ও বাজার মনিটরিং জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, আগাম আমদানি ও পর্যাপ্ত মজুতের কারণে আপাতত বাজারে স্বস্তি রয়েছে। তবে সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হলে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়বে। রমজানে চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়। সে সময় দাম বৃদ্ধি হলে তাদের ভোগান্তি বাড়বে। সরকার, বন্দর কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের দ্রুত সমন্বয় ছাড়া বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে। রমজানের বাজার যাতে অস্থির না হয়, সেজন্য সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনের ডামাডোলে বাজার মনিটরিং কিছুটা শিথিল ছিল। এর সুযোগ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, প্রশাসনের তদারকি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী দাম বাড়াচ্ছেন। এতে সাধারণ ক্রেতারা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজানের আর বেশি দিন বাকি নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা সব সময় দাম বাড়ানোর সুযোগ খোঁজে। আমরা চাই না সেই সুযোগ কেউ পাক। বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল হোক, রোজার আগে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ুক, তাতে ক্রেতারা স্বস্তি পাবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
এএইচ/এআর