মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে দেশের ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংক মারাত্মক সংকটে পড়ে। হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচারের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে চরম তারল্য সংকটে পড়ে সরকার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করতে বাধ্য হয়। এসব ঘটনায় ব্যাংক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপে ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। ব্যাংকের বাইরে হাতে থাকা নগদ টাকাও আবার ব্যাংকে জমা হচ্ছে।
এদিকে কয়েকটি ভালো ব্যাংক, পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর অবস্থা তুলনামূলক ভালো থাকায় ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতের স্থিতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের তুলনায় নভেম্বর মাসে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর আমানত বেড়েছে ২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। আর এক বছরের ব্যবধানে এসব ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানত ছিল ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। নভেম্বর মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক মাসে আমানত বেড়েছে ৯ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৫ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সেখানে আমানত বেড়েছে ৪১ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাস শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের আমানত ছিল ৪ লাখ ১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। পরের মাস নভেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে এসব ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ২ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ।
এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওমর ফারুক খান বলেন, ব্যাংক খাতে কিছু সমস্যার কারণে মানুষের আস্থায় ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। তবে তা এখন অনেকটাই কেটে যাচ্ছে। শুধু ইসলামিক ব্যাংকিং নয়, পুরো ব্যাংক খাতের ওপরই মানুষের আস্থা ফিরে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী ও সঠিক পদক্ষেপের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।
ওমর ফারুক খান বলেন, গত এক বছরে শুধু আমাদের ব্যাংকেই প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা আমানত বেড়েছে। সমস্যাগ্রস্ত কয়েকটি ব্যাংক একীভূত হওয়ায় মানুষের আস্থা বাড়ছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরছে এবং ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ আবার ব্যাংকে ফিরে আসছে। এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করছি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ইসলামিক ব্যাংক, শাখা ও উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ৬৯ কোটি ডলার। পরের মাস নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪ কোটি ডলারে। এক মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৫ কোটি ডলার বা ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
একই সময়ে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছে অক্টোবর মাসে ১০৩ কোটি ডলার এবং নভেম্বর মাসে ১০৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক মাসে আমদানি বিল পরিশোধ বেড়েছে ১ কোটি ডলার।
তবে রফতানি আয়ে কিছুটা ভাটা পড়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রফতানি আয় এসেছিল ৭৫ কোটি ডলার। নভেম্বর মাসে তা কমে দাঁড়ায় ৬৬ কোটি ডলারে। এক মাসে রফতানি আয় কমেছে ৯ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংকে সমস্যা থাকায় একসময় মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পেত। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক গঠনের পর সেই ভয় অনেকটাই কেটে গেছে। ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা আবার ফিরছে। এ কারণে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়ছে। এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে।
টিএই/জেবি