images

অর্থনীতি

ব্যাংক ঋণের বড় অংশ সরকারের পকেটে, সংকটে বেসরকারি খাত

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০২ এএম

  •  ৬ মাসে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি
  •  মোট ঋণ স্থিতি ছাড়িয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার কোটি
  •  এক বছরে ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ছয় গুণ
  •  বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরকারের ঋণ বেড়ে পৌনে ৩৬ হাজার কোটি
  •  কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি

রাজস্ব আদায় কম ও বৈদেশিক ঋণপ্রবাহে ভাটার প্রভাবে ব্যয় মেটাতে সরকার আবারও ব্যাংক খাতের দিকে ঝুঁকছে। অর্থবছরের শুরুতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নতুন ঋণ না নিয়ে বরং কিছু পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করেছিল সরকার। তবে অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে চিত্র পাল্টে যায়। উন্নয়ন ব্যয়ের গতি বাড়া, ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের চাপ, নির্বাচনি ব্যয় এবং বিভিন্ন বিশেষ বিনিয়োগের দায় সামাল দিতে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের গতি দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে একদিকে ব্যাংকিং খাতের তারল্যে চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাত পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়ায় বিনিয়োগ কার্যক্রমে স্থবিরতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ৫৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ব্যাংকঋণ লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থবছরের অর্ধেক সময় পেরোনোর আগেই সরকার লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও বেশি ঋণ তুলে নিয়েছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের মোট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস চার দিনে সরকার ব্যাংক খাত থেকে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, তা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬১৯ শতাংশ বেশি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ ছিল মাত্র ৮ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরে এই অংক কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। যদিও গত বছরের অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত সরকারের ব্যাংক ঋণ ঋণাত্মক ছিল—অর্থাৎ সে সময় সরকার নিট ৫০৩ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছিল—তবে পরবর্তী মাসগুলোতে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা দ্রুত বেড়ে যায়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে—রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সরকারের ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ মাজেদুল হক বলেন, সরকারের টার্গেট অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না, একই সঙ্গে প্রত্যাশিত বৈদেশিক ঋণও সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। অপরদিকে ভর্তুকি, সুদ পরিশোধ এবং উন্নয়ন ব্যয় আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে ঘাটতি মেটাতে সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংক খাত থেকেই বেশি ঋণ নিচ্ছে।

এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা কমে যায়, ফলে তারা বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় ঋণ দিতে পারে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়, বেকারত্ব বাড়ে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। টেকসই অর্থনীতির জন্য সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা কমানো জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের ৩০ জুন শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের মোট ঋণের পুঞ্জীভূত স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ২৩২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাস চার দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৩৫ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। তবে তুলনামূলকভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, গত অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ৬৩ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা—যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় বেশি। তবুও সামগ্রিক ব্যাংকঋণের প্রবণতা অর্থনীতিবিদদের উদ্বিগ্ন করছে, কারণ এবার ঋণ গ্রহণের বড় অংশ অর্থবছরের প্রথমার্ধেই সম্পন্ন হয়েছে।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও সরকারের ঋণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। গত অর্থবছরের ৩০ জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৯৮ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকায়। ফলে এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ২৪ হাজার ৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে, গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকে ৫৪ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা ঋণ ফেরত দিয়েছিল। সব মিলিয়ে বর্তমানে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অর্থবছরের শুরুতে সরকার উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম রাখায় এবং রাজস্ব আয়ের কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকায় তখন ঋণচাহিদা কম ছিল। পাশাপাশি সে সময় বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার কিছু কিস্তি পাওয়ায় সরকারের চাপও তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের দায় জমেছে এবং নির্বাচনি ব্যয়সহ অন্যান্য অনিবার্য খরচ যুক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগসহ কয়েকটি বিশেষ খাতে অর্থ জোগানের প্রয়োজন দেখা দেয়। এসব কারণেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা আবার জোরালো হয়েছে।

ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাত ‘ক্রাউডিং আউট’-এর শিকার হচ্ছে। অর্থাৎ সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর হাতে বেসরকারি খাতে দেওয়ার মতো তহবিল কমে যায়। এতে নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়, উৎপাদন সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর হয়ে পড়ে।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণ সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনতে না পারলে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ আরও বাড়বে। ফলে সরকারের পকেটে ব্যাংক ঋণ বাড়লেও সংকটে পড়বে বেসরকারি খাত—যার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিতেই পড়বে।

টিএই/জেবি