দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট, এলপি গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও চাঁদাবাজির চাপ একসঙ্গে রেস্তোরাঁ খাতকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে সিলিন্ডারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় রান্না ব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি নানামুখী হয়রানি ও অনৈতিক দাবিতে ব্যবসা পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি টিকে থাকা নিয়েই শঙ্কায় পড়েছে দেশের হাজারো রেস্তোরাঁ।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান। এ সময় সংগঠনের সভাপতি ওসমান গনি ও অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
ইমরান হাসান বলেন, ‘সরকারের কোনো উপদেষ্টা এলপি গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সংকট নিয়ে কথা বলছেন না। কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। শুধু ভোক্তা অধিদপ্তরের লোক দেখানো জরিমানায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। দেশে একটি লুটেরা ও সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপি গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বেশিরভাগ রেস্তোরাঁ গ্যাস পাচ্ছে না। যারা কিনতে পারছে, তাদের ১৩০০ টাকার সিলিন্ডারের জন্য ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এই সংকটের মধ্যেও পেট্রোবাংলার কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা নেই।’
সংবাদ সম্মেলনে ইমরান হাসান বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অর্ন্তর্বতী সরকারের প্রতি ব্যবসায়ী সমাজের প্রত্যাশা ছিল অনেক। মানুষ ভেবেছিল, অতীতের অন্যায় ও জুলুমের অবসান হবে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের বেশি সময় পার হলেও পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং প্রতিবন্ধকতা বেড়েই চলেছে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় কৃত্রিমভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট দেখিয়ে রেস্তোরাঁ খাতে পাইপলাইন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়। অথচ এই খাতে মাত্র ৫ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হতো। এর সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও আমলাদের যোগসাজশে আমদানিকৃত এলপি গ্যাসের বাজার একটি বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তারা একচেটিয়া ব্যবসা চালাচ্ছে।’
বিজ্ঞাপন
অতিরিক্ত দামে এলপি গ্যাস কিনে রান্না করতে গিয়ে রেস্তোরাঁগুলোর ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে বলে জানান তিনি। ফলে খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হলে গ্রাহক হারাচ্ছেন মালিকরা, আর লোকসান বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম সাধারণ মানুষকে দিশেহারা করে তুলেছে। বাজারে কখনো তেল, কখনো চাল, ডাল, পেঁয়াজের সংকট লেগেই আছে। এর সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁ খাতে।
এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ব্যক্তি ও কর্মচারী শ্রমিক সংগঠনের পরিচয়ে হুমকি, চাঁদাবাজি ও অনৈতিক সুবিধা আদায় করছে। দাবি পূরণে অস্বীকৃতি জানালে কোথাও কোথাও মালিকদের ওপর শারীরিক হামলার ঘটনাও ঘটছে। একটি কর্পোরেট গোষ্ঠী ট্রেড ইউনিয়নকে ব্যবহার করে রেস্তোরাঁ খাত দখলের ষড়যন্ত্র করছে। এসব নামে-বেনামে চাঁদাবাজি ও হুমকি বন্ধ না হলে রেস্তোরাঁ ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিকরা জ্বালানি সংকট নিরসন, মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ট্রেড ইউনিয়নের নামে নৈরাজ্য বন্ধ এবং ভোক্তা পর্যায়ে খাবারের দাম সহনীয় রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনি ইশতেহারে রেস্তোরাঁ খাত রক্ষায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা জানান, এই খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ জড়িত এবং প্রায় ৩০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। ভবিষ্যতে দেশের অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্য গ্রহণে রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভর করবে। রেস্তোরাঁ খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ না হলে এবং গ্যাস সংকটসহ সমস্যা সমাধান না হলে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা রাজপথে নামতে বাধ্য হবেন বলে সতর্ক করেন তারা।
এএইচ/এমআই

