জেলা প্রতিনিধি
০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম
ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে একসময় নির্মাণ করা হয়েছিল গুচ্ছগ্রাম বা আশ্রয়ন প্রকল্প। উদ্দেশ্য ছিল, আশ্রয়হীন মানুষগুলো পাবেন নিরাপদ আবাসন, ফিরে পাবেন স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই স্বপ্ন যেন অনেকটাই ফিকে।
৪০ বছর আগের নির্মাণ করা ঘরের টিনের চালায় মরিচা, কোথাও ভাঙা বেড়া, আবার কোথাও হেলে পড়ায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে বসবাস। রয়েছে যাতায়াতের পাকা রাস্তা ও সড়কবাতির সংকটও। এ ছাড়া হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ঘর ও জমি জোরপূর্বক লিখে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে মাদারীপুরে কালকিনি পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের ‘চর পাঙ্গাশিয়া’ গ্রামের গুচ্ছগ্রাম ঘুরে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরের চালা, ভাঙা টিনের বেড়া, আর নড়বড়ে কাঠামোর মধ্যে ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন বাসিন্দারা। সামান্য বৃষ্টিতেই ভিজে যায় ঘরের প্রয়োজনী জিনিসপত্র। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় দুর্ভোগের কারণ এখন সরকারি এই ঘর।
বাসিন্দারা জানান, নতুন ঘরের আশায় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে বারবার ধরনা দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি নতুন বাসস্থান। শুধু ঘরের সংকটই নয়, গুচ্ছগ্রামে যাতায়াতের জন্য নেই পাকা রাস্তা। বর্ষায় কাদাপানিতে চলাচল হয়ে পড়ে দুর্বিষহ। সড়কবাতির ব্যবস্থা না থাকায় রাত নামলেই নেমে আসে অন্ধকার। ফলে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের চলাচলে বাড়ে নিরাপত্তাহীনতা। মাদারীপুরের প্রায়ই প্রতিটি গুচ্ছগ্রামের চিত্র একই রকম।

এদিকে, আশ্রয়ের জন্য পাওয়া সরকারি ঘর ও জমি ঘিরেও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। ধারের মাত্র ২০ হাজার টাকা ধার পরিশোধ করতে না পারায় কালকিনি পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের ‘চর পাঙ্গাশিয়া’ গ্রামের ফজিলা বেগম এক বৃদ্ধার কাছ থেকে জোরপূর্বক তার সরকারি ঘরসহ জমি লিখে নেওয়া হয়েছে। ২০১০ সালের এ ঘটনার পরে গুচ্ছগ্রাম ছেড়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোরকম বেঁচে আছেন ছন্নছাড়া ফজিলা। সরকারি এই সম্পত্তি বিক্রয় বা হস্তান্তরযোগ্যের নিয়ম না থাকলেও সমঝোতার মাধ্যমে জমি কিনেছেন বলে দাবি অভিযুক্ত আব্দুল হাকিম হাওলাদারের। একইভাবে পাশের কবিরেরও ঘরসহ জমি কিনে নিয়েছেন হায়াত নামে আরেকজন।
তথ্য বলছে, জেলার ৫টি উপজেলায় ১৫টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। বসবাস করে প্রায় এক হাজার পরিবারের। অসহায় মানুষের মাথাগোজার ঠাঁইয়ের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে এসব গুচ্ছগ্রামের ঘর। নিয়মিত তদারকির অভাবে সরকারের এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতদরিদ্ররা। নতুন করে এই জরাজীর্ণ ঘরগুলো কি নির্মাণ করা হবে, দেখবে কি আলোর মুখ এমন প্রশ্ন থেকেই যায়।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা চম্পা বেগম বলেন, ‘সরকার ৪০ বছর আগে একখানা টিনশেড ঘর দিয়েছিল। সেই ঘর ভেঙ্গে গেছে। বসবাসের অনুপযোগি। বৃষ্টি হলে পানিতে সব নষ্ট হয়ে যায়। ঝড় হলে থাকি আতঙ্কে। আমরা এখানকার সবাই নতুন ঘর চাই।’
শিপন বালী নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘গুচ্ছগ্রামে কোনো বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান করতে গেলে জায়গা নাই। যার ফলে মেয়েদের ভাল কোনো স্থানে বিয়ে দিতে পারি না। ছেলেদের অনুষ্ঠানও হয় না ঠিকঠাক মতো। তাই সরকার বৃহৎ আকারে জমিসহ আমাদের নতুন একটি ঘর দিলে সবাই উপকৃত হব।’

ভুক্তভোগী ফজিলা বেগমের ছোটছেলে মো. হান্নান সরদার বলেন, ‘আমার মা ২০ হাজার টাকা ধার নেয়। সেই ধারের টাকা শোধ করতে না পারায় গুচ্ছগ্রামের সরকারের দেওয়া ঘর ও জমি লিখে নেয় হাকিম হাওলাদার। তিনি তৎকালীন পৌরসভায় চাকরি করতেন। ক্ষমতার জোড়ে আশ্রয়স্থলটুকু লিখে নেয় হাকিম। আমাদের থাকার জায়গা নেই। সরকারের কাছে আমার মায়ের জমিটুকু ফেরত চাই। পাশাপাশি হাকিমের বিচারও চাই।’
অভিযুক্ত আব্দুল হাকিম হাওলাদার বলেন, আমি টাকা নিয়ে জমি ও ঘর কিনেছি। এ বিষয় নিয়ে এলাকায় সালিশ-বৈঠকও হয়েছে একাধিকবার। পরে আমি কাগজপত্র ঠিক করেছি। ফজিলা বেগমের ঘর আমি জোরপূর্বক দখল বা দলিল করে নেয়নি।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, সরকারি ভূমিহীনদের বসবাসের জন্য ঘর দিয়েছে। কিন্তু এই জমি কখনই বিক্রয় বা হস্তান্তরযোগ্য নয়। যারা করেছে এমন কর্মকান্ড, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের জমি ফিরিয়ে দেওয়াসহ শিগগিরই গুচ্ছগ্রামের সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/এসআই