জেলা প্রতিনিধি
০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
প্রশাসনিক অনুমোদন নেই, হয়নি দরপত্র আহ্বানও। অথচ নিজের উদ্যোগে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল ভবন নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার উত্তরগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হাছান। সরকারি জমিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়টি জানার পর তা বন্ধ করে দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের একটি জরাজীর্ণ ভবনে বর্তমানে কৃষি ব্যাংকের স্থানীয় শাখার কার্যক্রম চলছে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ব্যাংকটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল কর্তৃপক্ষ। মূলত ব্যাংকটি পরিষদ চত্বরে ধরে রাখতেই প্রায় ১৫ দিন আগে নতুন দোতলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন চেয়ারম্যান। ভবনটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় অর্ধকোটি টাকা। পরিষদের পুকুর ইজারা থেকে পাওয়া অর্থ ও নিজস্ব আয় দিয়ে কাজ শুরুর কথা জানা গেছে।
সরেজমিনে উত্তরগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, ভবন নির্মাণের জন্য রড দিয়ে কয়েকটি পিলারের কাজ করা হয়েছে। পরে তা বন্ধ রাখা হয়েছে। আশপাশে পড়ে আছে নিম্নমানের খোয়া ও দুই ধরনের বালু।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি জমিতে অবকাঠামো নির্মাণের আগে নকশা অনুমোদন, প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ এবং দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের মতো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই নির্মাণকাজ শুরু করেন চেয়ারম্যান। এমনকি পরিষদ চত্বরে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না ইউনিয়ন পরিষদের সচিব।

নির্মাণকাজের চুক্তির বিষয়ে উত্তরগ্রাম ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি কুদ্দুস বলেন, ‘১ হাজার ২০০ বর্গফুটের ভবনের মিস্ত্রি ও শ্রমিকের কাজ আমরা নিয়েছি। ইউপি কৃষক দলের সহসভাপতি আমার চাচা প্রধান রাজমিস্ত্রি হিসেবে আছেন। চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমাদের শুধু তিন লাখ টাকার মজুরি চুক্তি হয়েছে। রড-সিমেন্টসহ সব মালামাল চেয়ারম্যান নিজে দিচ্ছেন। তবে এখন শুনছি, ভবনটি ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের হবে। তাই নতুন চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।’
স্থানীয় বিএনপির এক নেতা নিজেকে ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘সরকারি নিয়ম ভেঙে দরপত্র ছাড়াই কোনো ইউপি চেয়ারম্যান এভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে পারেন না। এটি পুরোপুরি বেআইনি।’
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান বলেন, পরিষদে কৃষি ব্যাংকের একটি শাখা ভাড়া দেওয়া আছে। ভবনটি জরাজীর্ণ হওয়ায় পরিষদের পক্ষ থেকে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিষদের আয়, পুকুর ইজারার টাকা এবং চেয়ারম্যানের তহবিল থেকে নির্মাণব্যয় মেটানোর কথা ছিল। তবে এ কাজের সুনির্দিষ্ট বাজেট বা বরাদ্দ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
অভিযোগের বিষয়ে উত্তরগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান আবু হাছান বলেন, ‘ওখানে এখনো কোনো সরকারি বরাদ্দ হয়নি। ব্যাংকটি চলে গেলে এলাকার ক্ষতি হবে, তাই জনস্বার্থেই কাজ শুরু করেছিলাম। কোথাও থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি, পুরোটাই আমার নিজস্ব টাকায় করছি। তবে এখন ঝামেলা হওয়ায় কাজ বন্ধ রেখেছি।
সরকারি জায়গায় ব্যক্তিগত অর্থে ভবন নির্মাণ করা যায় কি না, এমন প্রশ্নে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেন, ‘ভাই, এত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না।’
এ বিষয়ে মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মানজুরা মুশাররফ বলেন, ‘প্রকল্পটির একটি রেজুলেশন কেবল পাস হয়েছিল। কিন্তু নকশা অনুমোদন, কোটেশন আহ্বান কিংবা ঠিকাদার নিয়োগের মতো মূল কাজগুলো বাকি ছিল।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘ঘটনাটি জানার পরপরই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম মেনেই সেখানে কৃষি ব্যাংকের জন্য প্রকল্প নেওয়া হবে। তবে চেয়ারম্যান যেভাবে কাজ শুরু করেছিলেন, তা অন্যায়।’
প্রতিনিধি/এসএস