Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

নিয়ম না মেনেই গুরুদাসপুরে জ্বলছে ইটভাটার চুল্লি, হুমকিতে কৃষি-জনজীবন

জেলা প্রতিনিধি

০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

নাটোরের গুরুদাসপুরে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ও লাইসেন্সবিহীন ইটভাটার দৌরাত্ম্য কিছুতেই থামছেই না। আবাসিক ও ঘনবসতি এলাকায় যত্রতত্রভাবে এসব ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয় জনজীবন, কৃষিজমি, পরিবেশ ও পাকাসড়ক মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানা করা সত্ত্বেও অবৈধ ইটভাটাগুলোর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোর চিমনির উচ্চতা কম হওয়ায় নির্গত ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ফলে শ্বাষকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকার মানুষ। আশপাশের জমিগুলোতে মারাত্মক ফসলহানি ঘটছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ঘনবসতির মানুষেরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। ইট ও মাটি বহনকারী ট্রাক্টর-ট্রলির দাপটে নষ্ট হচ্ছে পাকা সড়ক। তিন ফসলি জমি কেটে ইট তৈরির মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে। ইটভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কাঠখড়ি। এসব ইটভাটা অনুমোদেনের কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি স্বত্বাধিকারীরা।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩/২০১৯ সংশোধন অনুযায়ী, কৃষি জমি, বনভূমি ও আবাসিক এলাকার কাছে ভাটা স্থাপন ও জ্বালানী হিসেবে কাঠ বা কয়লা ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া কৃষিজমি, পুকুর বা নদী, খাল ও জলাভূমি থেকে মাটি কেটে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, গত বছর পুকুর খননের কারণে ১২০ হেক্টর তিন ফসলি জমিতে কমে গেছে। এসব জমিতে ধান, পাট, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ হতো। ফলে ধানের আবাদ কমেছে প্রায় ১০০ টন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের শেষের দিকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত এক অভিযানে উপজেলার ৯টি অবৈধ ইটভাটাকে ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

gurudaspur-eitvata2

জানা যায়, পৌর সদর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মোট ১১টি ইটভাটা রয়েছে। এরমধ্যে মাত্র দুইটি ভাটার লাইসেন্স আছে। আবাসিক এলাকার ৫টি ইটভাটার মধ্যে চাঁচকৈড়ের মোশাররফ হোসেনের মেসার্স এমবিপি ব্রিক্স, আব্দুস সালাম সবুজের মেসার্স একেবি ব্রিক্স, জহুরুল সোনারের মেসার্স এমডিআর ব্রিক্স, জাহাঙ্গীর সোনারের মেসার্স এমডিএস ব্রিক্স, আমজাদ-মফিজের মেসার্স এএমবি ব্রিক্স তাদের ইটভাটা কার্যক্রম চালাচ্ছেন।

আবার উপজেলার সাহাপুরে রয়েছে আজাহার প্রামাণিকের মেসার্স এইচবিবি ব্রিক্স, আজাহার বালুর মেসার্স এইচআরবি ব্রিকস, কাদের হাজীর মেসার্স এইচকেবি ব্রিকস, মজনু সরদারের মেসার্স এমএসবি ব্রিক্স, হাজীর হাটে জাহিদুল ইসলামের মেসার্স এমডিপি ব্রিক্স, চন্দ্রপুরের রেজাউল হাসান রানার মেসার্স আরআরবি ব্রিকস। নিয়ম বহির্ভূতভাবে তিন ফসলি জমি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব ইটভাটা।

স্থানীয় মাসুদ রানা, জবতুল্লাহ মন্ডল, জাহের প্রামাণিক, সুজাউদ্দৌলা সুজন, কৃষক রফিকুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, প্রতি বছরই ইটভাটায় জরিমানা করা হয়। প্রশাসনের ‘দায়সারা’ অভিযানের পর ভাটাগুলো আবার চালু হয়ে যায়। স্থায়ীভাবে এই দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে ভাটাগুলো পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়েছে।

gurudaspur-eitvata22

উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ইটভাটার ভ্যাট, আয়কর, ট্রেডলাইসেন্স, কলকারখানাসহ বিএসটিআই ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স আছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র কারোরই নেই। তবে দুটি ভাটার লাইসেন্স আছে। পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হলে ইটভাটা মালিকদের জানাতে হবে।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, ইটভাটার জন্য নির্দিষ্ট আইন আছে। পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র বা লাইসেন্সবিহীন ইটভাটার বিরুদ্ধে বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিনিধি/এসআই