গরুর গোবর থেকে তৈরি হচ্ছে রান্নার জ্বালানি। এতে একদিকে যেমন বর্জ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে কমছে পরিবারের বাড়তি খরচ। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী গ্রামে বায়োগ্যাস ব্যবহারের এমন উদ্যোগ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রচলিত জ্বালানির বিকল্প হিসেবে স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব এই ব্যবস্থা।
শেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গ্রামটির ডেকরাপাড়ার বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ (৪৫) ছয়টি গরু পালন করেন। গরুগুলোর গোবর প্রক্রিয়াজাত করে তিনি প্রতিদিন বায়োগ্যাস তৈরি করছেন। সেই গ্যাসে রান্না হচ্ছে দুটি পরিবারের খাবার। গত ছয় মাস ধরে পরিবার দুটি এ গ্যাস ব্যবহার করছে। এতে তাদের জ্বালানি বাবদ মাসিক প্রায় চার হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।
নন্নী গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলামের ভাষ্য, বায়োগ্যাস ব্যবহারে বাড়তি কোনো বিড়ম্বনা নেই। বরং গোবর কাজে লাগিয়ে রান্নার জ্বালানি পাওয়ার পাশাপাশি অবশিষ্ট অংশ কৃষিজমিতে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। এতে পরিবারের খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশেরও উপকার হচ্ছে। তার মতে, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রামের আরেক বাসিন্দা ও মাদ্রাসাশিক্ষক খোকন মিয়া তিনটি গরু পালন করে সেগুলোর গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করায় আগে খড়ির চুলায় রান্না করা ছিল সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর। বায়োগ্যাস ব্যবহারের পর সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন গরু থেকে দুধ পাওয়ার পাশাপাশি রান্নার জ্বালানিও মিলছে। অল্প সময়েই রান্নার কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আগে প্রতি মাসে সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে দুই হাজার টাকা খরচ হতো। এখন সেই অর্থ আর ব্যয় করতে হচ্ছে না। এতে বছরে প্রায় ২৫ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য বায়োগ্যাস একটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবস্থা বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, নন্নী ইউনিয়নে বায়োগ্যাস ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিবেশীর উদ্যোগ দেখে উৎসাহিত হয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০টি পরিবার এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এসব পরিবারের মধ্যে কয়েকটি গরুর গোবরের পরিবর্তে পোলট্রির বিষ্ঠা ব্যবহার করেও বায়োগ্যাস উৎপাদন করছে।
বায়োগ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের বায়োগ্যাস প্লান্টের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মনসুর বলেন, একটি বাড়িতে তিনটি গরু থাকলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কেজি গোবর সংগ্রহ করা সম্ভব। এই গোবরের ২২ কেজি প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় এক কেজি গ্যাস পাওয়া যায়। উৎপাদিত এ গ্যাস দিয়ে একটি পরিবারের প্রতিদিনের রান্নার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। তার মতে, সহজলভ্য উপকরণ থেকে জ্বালানি পাওয়ায় নন্নী এলাকায় বায়োগ্যাসের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।
এদিকে, গ্রামীণ পর্যায়ে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের উদ্যোগে ‘ইমপ্যাক্ট প্রকল্প ফেজ-৩’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় শেরপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৮৫টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের কাজ চলছে। এর মধ্যে নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী ইউনিয়নে ইতোমধ্যে ৩০টি প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। বায়োগ্যাস ব্যবহারে স্থানীয়দের আগ্রহ ও সাফল্য বিবেচনায় নন্নী ইউনিয়নকে ‘বায়োগ্যাস পল্লি’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদফতরের উপপরিচালক হারুনর রশীদ জানান, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থায় স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রামের মানুষের রান্নার জ্বালানির চাহিদা পূরণে বায়োগ্যাস গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিনিধি/এসআই




