Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

৩০ ঘণ্টায়ও নেভেনি গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ

জেলা প্রতিনিধি

২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫১ এএম

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন ৩০ ঘণ্টা পেরিয়েও নেভানো যায়নি। ভূগর্ভ থেকে অবিরাম গ্যাস বের হওয়ায় আগুন জ্বলছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।

গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে কাজ শুরুর কথা রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দলের। মঙ্গলবার রাতেই দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করেছে।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলপ্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করেন, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল খননযন্ত্র। সেখান থেকে ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরে উঠে নলকূপের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।

তিনি বলেন, গ্যাসের স্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেলে উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে পথ তৈরি করে কয়েক দিন পরও ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের সংস্পর্শে কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন লাগার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

ময়মনসিংহে গভীর নলকূপ খননকালে গ্যাস নির্গমন, জ্বলছে আগুন

আগুনের শিখার রং ও ধোঁয়ার ধরন পর্যবেক্ষণ করে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। একই কারণে সেখানে কী পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে, সে বিষয়েও এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

নাফিফুন আরহাম বলেন, গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে বা এর চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখাই প্রধান অগ্রাধিকার। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি জানতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে।

যেভাবে আগুনের সূত্রপাত

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোটখাল সেতুর কাছে মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য মাটি খননের সময় ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। গর্ত থেকে দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস বের হওয়ার পরপরই সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে।

খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করে। তবে ভূগর্ভ থেকে গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। জনবল ও কারিগরি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পরে বাপেক্স, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।

আরও পড়ুন

নলকূপ বসাতে গিয়ে মাটির নিচে গ্যাস, আগুনে আতঙ্ক

এদিকে আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের হোটেলকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম ও আবু সৈয়দ বলেন, মাত্র ১০ দিন আগে ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আবার ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হয়ে আগুন জ্বলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

তারা বলেন, দূর থেকেও আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে। ফলে আশপাশের বাসিন্দা ও পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

ঘটনাস্থলের পাশের একটি পাঁচ তারকা হোটেলের কর্মী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘যেখানে আগুনের সৃষ্টি হয়েছে, তার পাশের ঘরেই আমরা কয়েকজন হোটেলকর্মী থাকি। এভাবে আগুন জ্বলতে থাকায় খুব ভয়ের মধ্যে আছি।’

১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ

আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাই আগুনের ঝুঁকি নিরূপণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ মিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে ইউএনও বলেন, ব্রিটিশ আমলে এ এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া হবে।

এখন বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের নমুনা সংগ্রহ ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপরই নির্ভর করছে ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের প্রকৃতি, উৎস ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পরবর্তী সিদ্ধান্ত।

প্রতিনিধি/এসএস