Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

চলনবিলে মাছের আকাল, অস্তিত্ব সংকটে শুঁটকি শিল্প

জেলা প্রতিনিধি

২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ এই পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সিরাজগঞ্জের চলনবিলের দেশি মাছ ও ঐতিহ্যবাহী শুঁটকিশিল্প। একসময় দেশি মাছের প্রাচুর্যে মুখর থাকত বিলপাড়ের শুঁটকিমহালগুলো। বাঁশের মাচায় সারি সারি মাছ শুকানো, শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা আর শুঁটকির ঘ্রাণে প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ত পুরো এলাকায়। সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই ম্লান। মাছের সংকটে কমছে উৎপাদন, বন্ধ হচ্ছে একের পর এক চাতাল। বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশের চাহিদার প্রায় ৫৮ শতাংশ শুঁটকি এখন আমদানি হচ্ছে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে। অথচ চলনবিলের শুঁটকির দেশজুড়ে সুনাম রয়েছে, বিদেশেও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঁচামাল সংকট ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে শিল্পটি কঠিন সময় পার করছে।

Sirajgonj_pic__(5)

জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জে বছরে মোট মাছ উৎপাদন ৭৮ হাজার ৯৪৫.১৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চলনবিল অধ্যুষিত উল্লাপাড়া ও তাড়াশে উৎপাদন ৫ হাজার ২৩০.৭৩ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ দুই উপজেলার ৬০টি শুঁটকিমহালে উৎপাদিত হয়েছিল ৩০২ মেট্রিক টন শুঁটকি, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৮৫.১৭ মেট্রিক টনে। এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩৮.৭ শতাংশ। চলতি মৌসুমে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে।

স্থানীয়দের মতে, একসময় যেখানে সারা বছর পানি থাকত, এখন বর্ষা ছাড়া পানি থাকে না। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত রাস্তা-বাঁধ নির্মাণ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়ায় মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে।

Sirajgonj_pic__(7)

সম্প্রতি উল্লাপাড়ার আড়ুয়া পাঙ্গাসী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি চাতালে নারী-পুরুষ শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত। বাঁশের মাচায় শুকানো হচ্ছে পুঁটি, খলশে, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, টাকি মাছ। তবে আগের তুলনায় কর্মচাঞ্চল্য কম।

চাতাল মালিক জাকারিয়া জানান, এখন শুঁটকির ভরা মৌসুম, কিন্তু চলনবিলে মাছের তীব্র সংকট। অন্য এলাকা থেকে মাছ কিনে আনতে হচ্ছে, এতে খরচ বাড়ছে। গত বছর ৩৫ টন হলেও এবার ১০-১৫ টন হবে কিনা সন্দেহ। তিনি বলেন, দেশে এখনো আধুনিক শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে ওঠেনি, সংরক্ষণেও ঘাটতি রয়েছে। সরকারি সহায়তা পেলে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব।

Sirajgonj_pic__(3)

নারী শ্রমিক শিল্পী বেগম জানান, শ্রমিকদের জীবন আরও কঠিন। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১১ ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পান মাত্র ২০০ টাকা। মহাল বন্ধ হলে তাদের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।

তাড়াশের মান্নাননগর এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, মাছের অভাবে প্রায় ৫০ শতাংশ মহাল বন্ধ, এতে প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক অর্থনৈতিক সংকটে। শোল, বোয়াল, পুঁটিসহ নানা মাছের শুঁটকি এখানে তৈরি হলেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না।

Sirajgonj_pic__(4)

ব্যবসায়ীদের তথ্যে, চলনবিলের শুঁটকির প্রায় ২০ শতাংশ বিদেশে যায়। আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতারসহ ১০-১২টি দেশে রপ্তানি হয়। মানের ভিত্তিতে এ, বি ও সি গ্রেডে ভাগ করা হয়। এ গ্রেড যায় বিদেশে, বি ও সি গ্রেড বিক্রি হয় ঢাকা, সৈয়দপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। বর্তমানে ছোট মাছের শুঁটকি মণ প্রতি ১৫-২৫ হাজার এবং বড় মাছের শুঁটকি ২২-৩৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম বলেন, একসময় মহালে জায়গার সংকুলান হতো না, এবার মাছের অভাবে নীরবতা। সরকার রাজস্ব পেলেও শিল্পের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেই।

Sirajgonj_pic__(8)

উল্লাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, দেশি মাছ সংরক্ষণে অবৈধ জাল বন্ধ ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, শুঁটকির মান উন্নয়নে চাতাল মালিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় ও প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা নিশ্চিত না হলে যে চলনবিল একসময় দেশি মাছের প্রাচুর্যে পরিচিত ছিল, সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আমদানিনির্ভর বাজারের চাপে হারিয়ে যাবে।

প্রতিনিধি/টিবি