শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

শুঁটকি গ্রামে আধুনিকতার ছোঁয়া, নজর কাড়ছে সবার

সুমন আলী, নওগাঁ
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৬ এএম

শেয়ার করুন:

শুঁটকি গ্রামে আধুনিকতার ছোঁয়া, নজর কাড়ছে সবার

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ভরতেঁতুলিয়া গ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই ‘শুঁটকির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। বংশপরম্পরায় খোলা আকাশের নিচে বাঁশের মাচায় শুঁটকি শুকানোর যে চিরচেনা দৃশ্য, সেখানে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তি। বৈরী আবহাওয়া আর ধুলাবালির ভয় উপেক্ষা করে স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসানের তৈরি এই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে পুরো এলাকায়।

স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আত্রাই-ছোট যমুনা নদী ও স্থানীয় বিলের টেংরা, পুঁটি, খলসে, টাকি, শোল ও চাঁদাসহ নানা প্রজাতির সুস্বাদু দেশীয় মাছ থেকে যুগ যুগ ধরে শুঁটকি তৈরি হয়ে আসছে। আত্রাই রেলস্টেশনের দুই পাশে ও নদীর ধারে বাঁশের মাচায় তৈরি এসব শুঁটকির কদর দেশজুড়ে তো বটেই, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও রয়েছে। তবে খোলা আকাশের নিচে রোদে শুকানোর কারণে ধুলাবালি, পোকামাকড়ের উপদ্রব এবং বৃষ্টি-কুয়াশায় বড় অঙ্কের মাছ পচে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকে যেত।

Pic-2

নতুন চালু হওয়া ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় সম্পূর্ণ হাইজেনিক উপায়ে মাছ শুকানো হচ্ছে। এই ড্রায়ার ঘরের চারপাশ স্বচ্ছ পলিথিন শিট দিয়ে ঢাকা। সূর্যের আলো যখন এর ভেতরে প্রবেশ করে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। মাছ শুকানোর সময় যে জলীয় বাষ্প তৈরি হয়, তা ড্রায়ারে থাকা এক্সহস্ট ফ্যানের মাধ্যমে গরম বাতাস সমানভাবে প্রবাহিত করা হয়। ফলে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে মাছের শরীরের ভেতরের আর্দ্রতা বা পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে চলে আসে। এতে দ্রুত মাছ শুকিয়ে যায় এবং মাছের প্রাকৃতিক রূপ, রঙ, স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অটুট থাকছে। যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরিতে ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগত, সেখানে আধুনিক ড্রায়ারে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টাতেই তৈরি হচ্ছে মানসম্মত শুঁটকি। ফলে প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও থেমে থাকছে না উৎপাদন।

Pic-5

তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান বলেন, আগে খোলা মাঠে মাচা পেতে মাছ শুকাতাম। বৃষ্টি বা ধুলাবালির কারণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মাছ নষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হতো। সেই অপচয় রোধ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরির ভাবনা থেকেই ইউটিউব ও ইন্টারনেট দেখে ড্রায়ার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিই। এর বড় সুবিধা হলো—সব সময় জীবাণুমুক্ত পরিবেশে মাছ শুকানো যায়। বর্তমানে অনলাইনের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের মাঝে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রথম অবস্থায় ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ ছোট পরিসরে করায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত শুটকি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। সরকার সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা দেয়, তবে এই পরিধি বাড়িয়ে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

Pic-6

মাচায় শুঁটকি তৈরি করা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যবসায় সবচেয়ে বড় চিন্তা বৃষ্টি আর কুয়াশা। পানি লাগলেই মাছ নষ্ট। রাকিবুল যেভাবে ড্রায়ারে কম সময়ে মানসম্মত শুঁটকি বানাচ্ছে, তাতে মাচার চেয়ে ঝুঁকি অনেক কম।

Pic-4

রিপন আকন্দ ও মঞ্জু মোল্লা বলেন, আমরা বংশপরম্পরায় রোদে ও মাচায় মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে আসছি। হুট করে বৃষ্টি বা অতিরিক্ত কুয়াশা নামলে মাছ পচে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। তবে আমাদের তৈরি ঐতিহ্যবাহী শুঁটকির আলাদা একটা স্বাদ আছে। তবে পুঁজির অভাবে ইচ্ছে থাকলেও আমরা প্রযুক্তির দিকে যেতে পারছি না।

নওগাঁ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস আলী বলেন, আত্রাইয়ের শুঁটকি শিল্পে ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তির ব্যবহার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় শুকানোয় মাছের পুষ্টিগুণ ও স্বাদ শতভাগ অক্ষুণ্ন থাকে। মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে আমরা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছি। এই খাতকে আধুনিক করতে ক্লাস্টারভিত্তিক সহায়তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা দেশীয় নিরাপদ আমিষের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলে দেবে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর