২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম
জীবনের ৬৩টি বছর পেরিয়ে গেলেও বাবার পরিচয় ও পারিবারিক স্বীকৃতির অপেক্ষা শেষ হয়নি বাবুল খানের। কে তার বাবা, কোথায় তার পৈতৃক বাড়ি, কেমন ছিল বাবার পরিবার। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ সময়। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও নিজের শিকড়ের সন্ধান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে অন্তত বাবার পরিচয় ও পরিবারের স্বীকৃতি নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে চান তিনি।
জানা যায়, বাবুল খানের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাজীরাবাদ ইউনিয়নের চান্দখালী গ্রামে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শৈশবে মায়ের সঙ্গে জীবিকার তাগিদে বরগুনা ছেড়ে খুলনায় চলে যেতে হয় তাকে। তখন বাবার পরিচয় বোঝার মতো বয়স হয়নি। কিছুটা বড় হওয়ার পর মায়ের কাছে বারবার বাবার পরিচয় জানতে চাইতেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন, তার বাবার নাম আমির খান। তাদের পৈতৃক বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাজীরাবাদ ইউনিয়নের চান্দখালী গ্রামে।
কিন্তু বাবার পরিচয় জানার পরও তার সঙ্গে পরিবারের সম্পর্কের পথ সহজ হয়নি। মাত্র ১৩ থেকে ১৪ বছর বয়সে মাকে হারান বাবুল। এরপর জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে খুলনায় বেড়ে ওঠেন তিনি। মায়ের মৃত্যুর পর বাবার পরিচয় জানার আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর হয়। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১০ সালের দিকে বাবার পরিচয় ও পরিবারের সন্ধানে খুলনা থেকে বরগুনায় আসেন বাবুল খান। তার অভিযোগ, পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে প্রত্যাশিত পরিচয় ও স্বীকৃতি পাওয়ার পরিবর্তে তাকে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। তবে তাতেও হাল ছাড়েননি তিনি। নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতি পেতে বারবার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এমনকি দুইবার কাজীরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করেছেন বলেও জানান তিনি।
বাবুল খানের দাবি, তাঁর মা ছিলেন আমির খানের দ্বিতীয় স্ত্রী। বাবার প্রথম স্ত্রীর ঘরে একটি মেয়ে ছিল। তাঁর ভাষ্য, বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সৎ বোনের অত্যাচার থেকে তাঁকে রক্ষা করতে অন্য চাচাদের পরামর্শে তাঁর মা ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন।

বাবুল খান বলেন, আমার মা ছিলেন বাবা আমির খানের দ্বিতীয় স্ত্রী। বাবার প্রথম স্ত্রীর ঘরে একটি মেয়ে ছিল। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সৎ বোনের অত্যাচার থেকে আমাকে রক্ষা করতে অন্য চাচাদের পরামর্শে মা ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। পরে বাবার পরিচয়ের জন্য দুইবার ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করেছি। তারপরও আমার সৎ বোনের সন্তানদের কাছ থেকে ‘জারজ সন্তান’ বলে গালাগাল শুনতে হয়েছে।
বাবার পরিচয় বাবুল খানের কাছে কেবল একটি নাম নয়; এটি তাঁর অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় ও পারিবারিক শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গভীর অনুভূতি। ছয় দশকেরও বেশি সময় পার হলেও সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। নিজের পরিচয়ের সন্ধানে এখনো মৃত আমির খানের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। সেখানে দাঁড়িয়ে হয়তো খোঁজেন জীবনের সেই উত্তর, যা এত বছরেও তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়নি।
বাবুল খানের চাচাতো ভাই মোজাম্মেল খান বলেন, বাবুল খান আমির খানের দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান। তার জন্মের পর পরিবারের পক্ষ থেকে হুমকির মুখে পড়ে তাকে নিয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তার মা। দীর্ঘ বছর পর ফিরে এসেও বাবার পরিচয় পাচ্ছেন না তিনি। আমরা জানি, বাবুল খান প্রকৃতপক্ষে আমির খানের ছেলে। বাবার পরিচয় পাওয়া তার অধিকার।
আরেক চাচাতো ভাই আবু খান বলেন, বাবুল খান আমির খানের ছেলে। তার জন্মের পর তার মাকে সৎ মেয়ের অত্যাচারের মুখে পড়তে হয়েছিল। এ কারণে আমাদের পরামর্শে একপর্যায়ে তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। এখন বাবুল খান পৈতৃক ভিটায় ফিরে এসেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিনি বাবার পরিচয় থেকেও বঞ্চিত। আমরা চাই, তিনি বাবার পরিচয় ফিরে পান এবং পৈতৃক ভিটায় নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ বাবুল খানের চাওয়া খুব বেশি নয়, নিজের বাবার পরিচয় ও পারিবারিক ইতিহাসের সত্যতা স্পষ্ট হোক, পরিবার তাকে স্বীকৃতি দিক। এত বছরের অপেক্ষা, বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটুক। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের শিকড়ের সন্ধান পেয়ে অন্তত আত্মপরিচয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে চান তিনি।
প্রতিনিধি/এসআই