মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

৬ ছেলের কারও ঘরে ঠাঁই হলো না ৮৫ বছরের মায়ের, শেষ আশ্রয় মেয়ের বাড়ি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁদপুর
প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম

শেয়ার করুন:

৬ ছেলের কারও ঘরে ঠাঁই হলো না ৮৫ বছরের মায়ের, শেষ আশ্রয় মেয়ের বাড়ি
বৃদ্ধা জয়নব ভানু

চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা জয়নব ভানুর জীবনের গল্প যেন এক বুকভরা দীর্ঘশ্বাস। যে সন্তানদের বুকে আগলে বড় করেছেন, জীবনের শেষ বয়সে এসে সেই ছেলেদের কারও ঘরেই ঠাঁই মেলেনি তার। একটি-দুটি নয়, নিজের ছয় ছেলের ঘরের বন্ধ দরজায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও কোনো সাড়া মেলেনি।

জানা গেছে, তিনি বারবার দরজায় টোকা দিয়েছেন এবং অপেক্ষা করেছেন- কেউ হয়তো দরজা খুলে তাকে ভেতরে নেবেন। কিন্তু তার সেই আশার অবসান ঘটেনি। শেষ পর্যন্ত বন্ধ দরজার সামনে বসেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন অসহায় এই মা। 

মায়ের এমন করুণ অবস্থার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় সৃষ্টি হয় তোলপাড়। আর ছয় ছেলের ঘরে ঠাঁই না পাওয়া জয়নব ভানুর শেষ আশ্রয় হয়েছে মেয়ে ঝর্ণা বেগমের বাড়ি।

ঘটনাটি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব কাদরা গ্রামের। জয়নব ভানু ওই গ্রামের মৃত সৈয়দ আহমেদের স্ত্রী। বহু বছর আগেই স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। জীবনের শেষ বয়সে ছয় ছেলেকে ঘিরেই ছিল তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। অথচ, অসুস্থতা আর বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়া সেই মায়ের জন্য সন্তানদের ঘরের দরজাগুলোই যেন বন্ধ হয়ে গেল।

গত ১৮ অক্টোবর দুপুরে ছেলেদের কারও ঘরে আশ্রয় না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন জয়নব ভানু। একপর্যায়ে স্বামীর ভিটায় একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি করে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি। জীবনের শেষ সময়টুকু অন্তত নিজের পরিচিত মাটিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে কাটাতে চান এই বৃদ্ধা।

Old_lady_Zainab_Bhanu

জয়নব ভানুর অভিযোগ, দীর্ঘ এক মাস কুমিল্লায় চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়িতে ফিরে ছেলেদের ঘরে প্রবেশ করতে পারেননি তিনি। দীর্ঘক্ষণ দরজায় ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া না পেয়ে অসহায় অবস্থায় বসে থাকেন দরজার সামনে। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাকে দেখতে পেয়ে কাছে যান এবং তার খোঁজখবর নেন। তাদের সামনেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্বামীর ভিটায় একটি কুঁড়েঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি।

বৃদ্ধা মায়ের এমন অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন দাবি।

জয়নব ভানুর মেজো ছেলে আবুল কাশেম দাবি করেন, দীর্ঘ এক বছর তার মা কোথায় ছিলেন, তা তিনি জানেন না। তিনি মাকে কয়েকবার ডেকেছেন বলেও জানান। বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী বলেন, বৃদ্ধা তাদের ঘরের দরজার সামনে কয়েক মিনিট বসেছিলেন। এরপর কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না। সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রীও দাবি করেন, জয়নব ভানু কখন এসেছেন, সে বিষয়ে তারা অবগত নন।

মায়ের এমন পরিস্থিতির খবর পেয়ে ছুটে আসেন মেয়ে ঝর্ণা বেগম। তিনি বলেন, ‘বিশ বছর ধরে তারা আমার মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করছে। তারা চায়, আমার মাকে আমার বাড়িতে তুলে দিতে।’

স্থানীয় আব্দুল কাদের খান ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক উল্লেখ করে বলেন, বিষয়টি এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম বেলাল বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে বার্ধক্যে একজন মায়ের সঙ্গে এমন ঘটনা সত্যিই হৃদয়বিদারক। সামাজিকভাবে ছেলেদের বিচার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’

এদিকে, ঘটনাটি জানার পর মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন বৃদ্ধার পরিবারের সদস্যদের তার কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে খোঁজখবর নেন।

Old_lady_Zainab_Bhanu২

জয়নব ভানুর ছয় ছেলের মধ্যে শাহজাহান ও আবুল কাশেম বাড়িতে বসবাস করেন। বাকি চার ছেলে প্রবাসে থাকেন বলে জানা গেছে।

শেষ পর্যন্ত ছেলেদের ঘরে আশ্রয় না পেয়ে মেয়ে ঝর্ণা বেগমই মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন ৮৫ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন মায়ের আকুতি- নিজের স্বামীর ভিটায় ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর, যেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে, যেখানে অন্তত পরবাসীর মতো দিন কাটাতে হবে না। যে সন্তানদের মানুষ করতে জীবনের সঞ্চয়, শ্রম আর মমতা উজাড় করে দিয়েছেন, তাদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সেই মায়ের আশ্রয় চাওয়ার দৃশ্য সমাজের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বৃদ্ধা জয়নব ভানুর এই করুণ পরিণতি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়েও নতুন করে ভাবার বার্তা দেয়।

প্রতিনিধি/এসআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর