জেলা প্রতিনিধি
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম
পরিবারের অভাব ঘোচাতে ২০২২ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুবক নজরুল ইসলাম। কিন্তু প্রবাসে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় ২০২৩ সালে একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে গ্রেফতার হন তিনি। তিন বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি তার এবং অভিযুক্ত নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানায় সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ। তবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল কিনা সেটা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। তাছাড়া এই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া নিয়েও চলছে নানা সমালোচনা।
নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। কৃষক পরিবারের চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। পরিবারের অভাব দূর করে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচার আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান তিনি। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রবাসে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর, ২০২৩ সালে মক্কার একটি মসজিদ থেকে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীসহ নজরুলকে অনৈতিক কাজের অভিযোগে গ্রেফতার করে সৌদি পুলিশ। এরপর রিয়াদ ও মক্কার কারাগারে বন্দি ছিলেন তিনি। তার কারাবাসের সময়কাল ছিল প্রায় তিন বছর।
নজরুলের মা রহিমা বেগম ঢাকা মেইলকে জানান, কারাগারে থাকলেও প্রতি রোববার নিয়ম করে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন ছেলে। কিন্তু গত সপ্তাহে আর ফোন আসেনি। পরে গণমাধ্যমের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। একই ঘটনায় সুইটি আক্তারেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে জানতে পারে পরিবার।
ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ভেঙে পড়েছেন বাবা আব্দুল বাছির। অসুস্থ শরীরে বারবার বিলাপ করে তিনি বলছেন, ‘আমার ছেলে কী অপরাধ করেছে, তা আমি জানি না। একমাত্র আল্লাহই জানেন। কিন্তু কেন আমাদের একবার জানতেও দেওয়া হলো না?’
নজরুলের মৃত্যুর খবরের শোক সইতে পারেননি তার আপন ফুফু আবেদা বেগমও। ভাতিজার মৃত্যুর খবর শোনার পরদিন রাতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। পরিবারের এক সদস্যের মৃত্যুর শোকের মধ্যেই আরেক সদস্যকে হারিয়ে দিশাহারা স্বজনেরা।
নজরুলের পরিবারের এই সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, আইনি লড়াইয়ের সুযোগ কিংবা শেষবারের মতো স্বজনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ না পেলেও অন্তত নজরুলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
পরিবার ও গ্রামবাসীর আকুতি, সরকার যেন রাষ্ট্রীয় খরচে নজরুলের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করে। শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখে তাকে নিজ গ্রামের মাটিতে দাফন করতে চান তার হতভাগ্য বাবা-মা।
এদিকে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। তাদের আটক, বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্র। এমনকি তাদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্যও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি জানার পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দুই বাংলাদেশির পরিবার কিংবা দূতাবাসকে অবহিত না করার মাধ্যমে সৌদি আরব কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের বিধান লঙ্ঘন করেছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও অভিবাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, আটক বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার অধিকার নিশ্চিত না করা হলে তা ভিয়েনা কনভেনশনের লঙ্ঘন হতে পারে। তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার হওয়ায় বাংলাদেশকে এ বিষয়ে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা আছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। ফলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া, কনস্যুলার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কিনা এবং তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে কিনা— এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তথ্য বিনিময়ে ঘাটতি থাকার কথা স্বীকার করেছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, কেন এই ঘাটতি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর, ভালো ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই এ ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি কেন তৈরি হলো, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানার পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। সৌদি সরকারের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, সৌদি আরবের নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে এবং দেশটির আইন অনুযায়ী অপরাধের বিচার ও শাস্তি কার্যকর করা হয়। তবে বিদেশে কোনো বাংলাদেশি আটক হলে তার দেশের দূতাবাসকে অবহিত করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার সুযোগ থাকে। এ ঘটনায় তথ্য না পাওয়ার বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের বসবাসরত দেশের আইন মেনে চলার আহ্বান জানান।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়ার পর মরদেহ কীভাবে ও কখন দেশে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে অবহিত না করার ঘটনা কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের বিধান লঙ্ঘন করেছে কিনা, সেই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার আগে সরকার চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চাইছে না।
এদিকে সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির একজন অভিবাসী শ্রমিক এবং অন্যজন ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তাদের একজনের বাড়ি বগুড়ায়, অন্যজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা। সোমবার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আকাশপথে যোগাযোগ ও সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তবে তাদের পরিচয়, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে অবহিত না করার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সরকার।
প্রতিনিধি/জেবি