Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

জরাজীর্ণ ঘরেই ধান নিয়ে গবেষণা, ২১ বছরে ২৫ জাত উদ্ভাবন সেন্টু হাজংয়ের

জেলা প্রতিনিধি

১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম

আধুনিক গবেষণাগার কিংবা উন্নত প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষক সেন্টু চন্দ্র হাজং (৫৫)। মাত্র ১২ কাঠা জমিতে পরীক্ষামূলক চাষের মাধ্যমে ২১ বছরের প্রচেষ্টায় ২৫টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন বলে দাবি তার। তার উদ্ভাবিত ধানের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে স্থানীয় কৃষকদের। পাশাপাশি দেশি ধানের বিলুপ্তপ্রায় জাত সংরক্ষণেও কাজ করছেন তিনি।

নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা সেন্টু হাজং এসএসসি পাসের পর আর্থিক সংকটে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেমে গেলেও কৃষি নিয়ে নতুন কিছু করার স্বপ্ন ছাড়েননি। সেই আগ্রহ থেকেই ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজে যুক্ত হন তিনি।

প্রত্যন্ত গ্রামের একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসেই চলে তার গবেষণার পরিকল্পনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। নেই নিজস্ব গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা। সীমিত সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই বছরের পর বছর ধানের বিভিন্ন জাত নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

সেন্টু হাজংয়ের উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলোর মধ্যে ‘সেন্টু শাইল’, তিন ধরনের সেন্টু পাইজাম, তিন ধরনের চিনি শাইল ও তুলশিমালা উল্লেখযোগ্য। তার উদ্ভাবিত জাতগুলো সেন্টু-১ থেকে সেন্টু-২৫ পর্যন্ত নামকরণ করা হয়েছে। প্রথম সফল জাত ‘সেন্টু শাইল’ উদ্ভাবন করতে তাঁকে টানা সাত বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়েছে। এ সাফল্য তাকে পরবর্তী সময়ে আরও নতুন জাত উদ্ভাবনে উৎসাহিত করে।

সেন্টু হাজং জানান, ২০০৫ সালে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন তিনি। ধানের দুটি ভিন্ন জাতের মধ্যে সংকরায়ণ বা ব্রিডিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে নতুন জাত তৈরির চেষ্টা করেন। একটি জাত উদ্ভাবনের পর সেটির উপযোগিতা যাচাই করতেও দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয় তাকে।

গবেষণার জন্য নিজের ১২ কাঠা জমিতে ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট তৈরি করেছেন সেন্টু হাজং। বছরের বিভিন্ন সময়ে এসব প্লটে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করে পরীক্ষা চালান তিনি। কোনো পরীক্ষা ব্যর্থ হলে থেমে না গিয়ে নতুন করে চেষ্টা করেন। এভাবেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় একের পর এক জাত উদ্ভাবনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন এই কৃষক।

আরও পড়ুন

বৃষ্টির ফোঁটা থেকে তৈরি হবে বিদ্যুৎ, যুগান্তকারী উদ্ভাবন!

তার দাবি, ইতোমধ্যে ২৫টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। আরও দুই শতাধিক জাত উদ্ভাবনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। স্থানীয় অনেক কৃষক তার উদ্ভাবিত ধান চাষ করে লাভবান হচ্ছেন বলেও জানান তিনি। বিশেষ করে ‘সেন্টু শাইল’ জাতটি চাষিদের মধ্যে চাহিদা তৈরি করেছে।

নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি দেশি ধানের বৈচিত্র্য সংরক্ষণেও কাজ করছেন সেন্টু হাজং। তার জমিতে প্রতিবছর বিভিন্ন স্থানীয় জাতের ধান পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে বগি, হালই, গোলাপী, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল ও খাসিয়াবিন্নিসহ নানা জাত। বর্তমানে ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নিসহ আরও কয়েকটি জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন তিনি।

এসব ধান চাষে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবর ও নিজের তৈরি কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেন সেন্টু। তার মতে, স্থানীয় ধানের জাতগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। অনেক জাত হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ প্রতিটি জাতেরই রয়েছে স্বতন্ত্র স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য। কোনো কোনো জাতের ধানে পোকামাকড়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হয়।

দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি প্রণোদনা বা বিশেষ কোনো সহায়তা পাননি বলে জানান সেন্টু হাজং। স্থানীয় কৃষি বিভাগ তার কাজ সম্পর্কে অবগত থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে কোনো স্বীকৃতি পাননি তিনি। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষণা।

নিজের গবেষণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে সেন্টু হাজং বলেন, এখনো তার নিজস্ব কোনো গবেষণাগার নেই। জরাজীর্ণ ঘরে বসেই ধানের জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয় তাকে। সরকারিভাবে একটি গবেষণাগার নির্মাণ করে দেওয়া হলে দেশি ধানের আরও অনেক জাত সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজও আরও বিস্তৃত করা যাবে।

সেন্টু হাজং বলেন, দেশি ধানের বৈচিত্র্য ধরে রাখা এবং নতুন জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। এ কাজে সরকারি সহযোগিতা পেলে গবেষণার পরিধি বাড়বে এবং হারিয়ে যেতে বসা ধানের জাতগুলো ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা সহজ হবে।

প্রতিনিধি/এসএস