বৃষ্টির ফোঁটা থেকেও এবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে! স্পেনের গবেষকরা মাত্র একশো ন্যানোমিটার পুরু এক স্বচ্ছ কোটিং বা আবরণ তৈরি করেছেন, যা সোলার প্যানেলে পানির ফোঁটা গড়িয়ে যাওয়ার সময় বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করতে সক্ষম। প্রযুক্তিটি বর্তমানে গবেষণাগারেই পরীক্ষাধীন রয়েছে।
এতদিন আমরা সূর্যের আলো বা বাতাসের শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা শুনে এসেছি। এবার স্পেনের সেভিলের একটি গবেষণাগারের গবেষকরা বৃষ্টির ফোঁটার গতিশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। তারা মাত্র একশো ন্যানোমিটার পুরু একটি বিশেষ আবরণ তৈরি করেছেন, যা সোলার প্যানেলের উপর প্রয়োগ করা সম্ভব। প্যানেলের উপর পানির ফোঁটা পড়ে যখন সেই আবরণের উপর দিয়ে গড়িয়ে যায়, তখন বৈদ্যুতিক চার্জ উৎপন্ন হয়। গবেষকদের দাবি, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সোলার এনার্জি ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। পরীক্ষায় একটি পানির ফোঁটা থেকে একশো ভোল্টের বেশি, সর্বোচ্চ প্রায় একশো দশ ভোল্ট পর্যন্ত পিক ভোল্টেজ পাওয়া গেছে।

গড়িয়ে যাওয়া পানির ফোঁটা থেকে কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তার মূল ভিত্তি হলো ট্রাইবোইলেকট্রিক প্রভাব বা ট্রাইবোইলেকট্রিক ইফেক্ট। দুটি ভিন্ন পদার্থের পৃষ্ঠ পরস্পরের সংস্পর্শে এসে আবার আলাদা হলে তাদের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জের আদান-প্রদান ঘটে। একইভাবে, পানির ফোঁটা যখন ফ্লোরিনযুক্ত একটি বিশেষ পৃষ্ঠের উপর দিয়ে গড়িয়ে যায়, তখন পানি ও পৃষ্ঠের মাঝে বৈদ্যুতিক চার্জের পার্থক্য তৈরি হয়।
তবে সোলার প্যানেলের উপর শুধু পানির ফোঁটা স্থিরভাবে জমে থাকলেই বিদ্যুৎ তৈরি হবে না। ফোঁটাটি প্যানেলের পৃষ্ঠের উপর দিয়ে গড়িয়ে বা সরে যাওয়ার সময়ই মূলত চার্জের স্থানান্তর ঘটে। এর ফলে একটি বৈদ্যুতিক বিভব তৈরি হয় এবং উপযুক্ত সার্কিটের মধ্য দিয়ে কারেন্ট প্রবাহিত হতে পারে।
গবেষকদের তৈরি প্রায় একশো ন্যানোমিটার পুরু আবরণটি এই চার্জ উৎপাদন ও সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই আবরণটি নব্বই শতাংশেরও বেশি স্বচ্ছ হওয়ায় এটি সোলার সেলের উপর সূর্যের আলো পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। ফলে বৃষ্টি না থাকলে প্যানেল সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।
গবেষকরা প্রায় একশো ন্যানোমিটার পুরু যে ফ্লোরিনযুক্ত পলিমার আবরণ তৈরি করেছেন, তার স্বচ্ছতা নব্বই শতাংশের বেশি। এর ফলে বৃষ্টির অনুপস্থিতিতে সূর্যের আলো সহজে সোলার সেলে পৌঁছাতে পারে।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই আবরণের উপর দিয়ে একটি পানির ফোঁটা গড়িয়ে যাওয়ার সময় সর্বোচ্চ প্রায় একশো দশ ভোল্টের পিক ভোল্টেজ তৈরি হতে পারে। তবে উচ্চ ভোল্টেজ তৈরি হলেও কারেন্ট ও মোট উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। বৃষ্টি না হলে সোলার প্যানেল প্রচলিত পদ্ধতিতেই সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, আর বৃষ্টির সময় পানির ফোঁটার চলাচল থেকে অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক শক্তি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে।
এই প্রযুক্তি পেরোভস্কাইট সোলার সেলের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় হতে পারে। পেরোভস্কাইট সেল তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায় এবং পরীক্ষামূলকভাবে উচ্চ শক্তি-রূপান্তর দক্ষতা দেখিয়েছে। তবে এর প্রধান সমস্যা হলো আর্দ্রতার প্রতি সংবেদনশীলতা। ফ্লোরিনযুক্ত এই আবরণ সোলার সেলের পৃষ্ঠকে পানি ও আর্দ্রতা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বৃষ্টির ফোঁটা থেকে বৈদ্যুতিক চার্জ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করে। ফলে একই আবরণ সোলার সেলের সুরক্ষা এবং অতিরিক্ত শক্তি সংগ্রহ—উভয় কাজেই ব্যবহার করা যাবে।
বর্তমানে এই প্রযুক্তি মূলত গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। পরীক্ষাগারে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও বাস্তব পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে সোলার প্যানেলের উপর এর কার্যক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং বিভিন্ন আবহাওয়ায় পারফরম্যান্স যাচাই করা এখনও বাকি আছে।
আরও পড়ুন: লোডশেডিং কী? কেন হয়
এছাড়া একটি অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো, বৃষ্টির ফোঁটা থেকে উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ এত বেশি নয় যে তা দিয়ে একটি বাড়ির সমস্ত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো সম্ভব। তবে কম বিদ্যুৎপ্রয়োজন এমন ওয়্যারলেস রিমোট সেন্সর, হাইওয়ে সাইনেজ, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ স্টেশন এবং ছোট সহায়ক আলো সচল রাখতে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে।
অর্থাৎ, এই প্রযুক্তির লক্ষ্য প্রচলিত সৌরবিদ্যুতের বিকল্প তৈরি করা নয়। বরং একই সোলার প্যানেলকে বৃষ্টি ও রোদ—উভয় প্রাকৃতিক শক্তির উৎস থেকেই বিদ্যুৎ সংগ্রহে সক্ষম করে তোলাই এর মূল সম্ভাবনা। বাস্তব পরিবেশে পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার পরই কেবল বোঝা যাবে, বাণিজ্যিকভাবে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর ও টেকসই হতে পারে।
এজেড




