Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

অভাব জয় করে দুর্গাপুর এখন ‘হাঁসের গ্রাম’

জেলা প্রতিনিধি

১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৫ পিএম

পিরোজপুর শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত নিভৃত এক গ্রাম দুর্গাপুর। চারদিকে বিস্তৃত খাল-বিল, নালা আর প্রাকৃতিক জলাশয় সমৃদ্ধ এই গ্রামটিতে একসময় অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই দৃশ্যপট এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রকৃতির অঝোর দান—পানি আর প্রাকৃতিক খাবারকে পুঁজি করে বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালন শুরু করেন এলাকার মানুষ। আজ দুর্গাপুর আর দশটা সাধারণ গ্রামের মতো নয়; কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে গ্রামটি পুরো পিরোজপুর জেলায় পরিচিতি পেয়েছে ‘হাঁসের গ্রাম’ হিসেবে। 

​একটি গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার কেবল হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী হওয়ার এমন দৃষ্টান্ত দেশে বেশ বিরল। গ্রামজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক হাঁসের খামার। এসব খামার থেকে প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার ডিম। ডিম ও হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করে এখানকার মানুষের ঘরে ঘরে এখন আর্থিক স্বচ্ছলতা। প্রতি মাসে গ্রামটিতে ডিম ও বাচ্চা বিক্রি থেকে আয় হচ্ছে কয়েক লাখ টাকা। অনেক খামারির মাসিক নিট আয় দাঁড়িয়েছে লাখ টাকার ওপরে। 

1000026609

​দুর্গাপুর গ্রামের সফল খামারিদেরই একজন সায়েম হাওলাদার। লেখাপড়ার পাশাপাশি আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের গল্প শোনাচ্ছিলেন তিনি। সায়েম জানান, এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পর অবসর সময়ে সিদ্ধান্ত নেন হাঁস পালনের। শুরুর গল্পটা খুব একটা সহজ ছিল না। মাত্র ৫০টি হাঁস নিয়ে খামার যাত্রা শুরু করেন তিনি। 

​নিবিড় পরিচর্যা, সঠিক যত্ন আর অদম্য মেধা কাজে লাগিয়ে আজ সায়েমের খামারে রয়েছে প্রায় ৮০০ হাঁস। সায়েম বলেন, পরীক্ষার পর বসে না থেকে অল্প কিছু হাঁস দিয়ে শুরু করেছিলাম। হাঁসগুলো মুক্ত জলাশয়ে চরে বেড়ায়, তাই অতিরিক্ত কৃত্রিম খাবারের খরচ অনেক কম হয়। বর্তমানে ডিম ও বাচ্চা বিক্রি করে আমি পুরোপুরি স্বাবলম্বী। পরিবারের খরচ চালিয়ে ভালো অঙ্কের টাকা সঞ্চয়ও করতে পারছি।

​সায়েম হাওলাদারের মতো একই গ্রামের জোবায়ের, শফিক, আরিফসহ দুই শতাধিক খামারি আজ স্বাবলম্বী। যাদের একসময় দিন আনতে পান্তা ফুরাতো, তারা আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন এবং এলাকার আরও অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। 

1000026607

​বর্তমানে দুর্গাপুর গ্রামে বাণিজ্যিক সম্ভাবনার সুবাতাস বইলেও খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজও কম নয়। স্থানীয় খামারিরা জানান, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর বাজারে ডিমের দাম কিছুটা কম। কিন্তু হাঁসের প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ওষুধ ও সম্পূরক খাদ্যের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে। উৎপাদিত ডিমের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় গত বছরের তুলনায় তাদের মুনাফা কমেছে, যার ফলে তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। 

​দুর্গাপুরের খামারিদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ—প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসার অভাব। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এত বড় পরিসরে হাঁস পালন হলেও তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক খামার ব্যবস্থাপনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। 

1000026613

​খামারিদের ভাষ্যমতে, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রায়ই খামারে বিভিন্ন মারণব্যাধি ও রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এলাকায় আধুনিক প্রাণী চিকিৎসা কেন্দ্র বা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অনেক সময় হঠাৎ হাঁস মারা গিয়ে খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েন। 

​খামারিরা জোর দাবি জানিয়ে বলেন, আমরা যদি সঠিক সময়ে সরকারি প্রশিক্ষণ পেতাম এবং খামারের কাছেই প্রয়োজনীয় ওষুধের সরঞ্জাম ও চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হতো, তবে ক্ষতির ঝুঁকি অনেক কমে যেত। এছাড়া সরকারি মাধ্যমে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে খামারগুলোর পরিধি আরও বড় করা সম্ভব হতো।

1000026611

পিরোজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. তরুণ কুমার সিকদার জানান, দুর্গাপুরের খামারিদের সাফল্য পিরোজপুরের সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য বড় এক অনুপ্রেরণা। 

 

​তিনি বলেন, দুর্গাপুরে বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালন আরও সহজ ও লাভজনক করতে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে খামারিদের নিয়মিত পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। খামারিরা যাতে হঠাৎ রোগবালাইয়ের কারণে ক্ষতির মুখোমুখি না হন, সেজন্য প্রতিষেধক টিকাদান কার্যক্রম ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে খামারিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যাপারেও নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

প্রতিনিধি/টিবি