পুঁজি ছিল সামান্য, কিন্তু ছিল অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভাগ্যকে বদল করেছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সিংড়া ইউনিয়নের রামেরসরপুর গ্রামের হামিদ মিয়া। দুই দশকে মাত্র ৮০টি হাঁস থেকে প্রায় ৭৫০টিতে পরিণত করেছেন তিনি। এখন এই খামার থেকেই তার পরিবারের স্বপ্ন বুনছে নতুন ভবিষ্যৎ। সংসারের ব্যয়, সন্তানের উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের সঞ্চয় সবকিছুর ভরসা আজ তার এই হাঁসের খামার।
দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর আগে অল্প পুঁজি নিয়ে হাঁস পালন শুরু করেছিলেন হামিদ মিয়া। শুরুটা ছিল কষ্টের। সংসারের চাহিদা মেটানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক প্রতিকূলতা, লোকসান এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি থেমে যাননি। ধৈর্য, পরিশ্রম এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে নিজের খামারকে বড় করেছেন।
বর্তমানে তার খামারে রয়েছে প্রায় ৭৫০টি হাঁস। প্রতিদিন এসব হাঁস থেকে ২৫০ থেকে ৩০০টি ডিম উৎপাদিত হয়। বাজারদরের ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২৫০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। মাস শেষে এই আয় দাঁড়ায় প্রায় ৯৭ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে।

হামিদ মিয়ার খামারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো খোলা মাঠে প্রাকৃতিক খাদ্যনির্ভর হাঁস পালন। ধান কাটার পর কৃষকদের ফেলে রাখা জমিতে হাঁস ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে হাঁসগুলো শামুক, পোকামাকড় এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাদ্য খেয়ে বেড়ে ওঠে। এতে বাণিজ্যিক খাদ্যের ব্যবহার অনেক কমে যায় এবং উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। প্রতিদিন ভোরে হাঁসগুলোকে মাঠে ছেড়ে দেওয়া এবং সন্ধ্যায় নিরাপদে খামারে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়েই শুরু ও শেষ হয় তার প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততা। হাঁসের খামার থেকেই আসা আয় দিয়ে চলছে হামিদ মিয়ার পুরো সংসার। শুধু দৈনন্দিন ব্যয় নয়, সন্তানদের উচ্চশিক্ষার ব্যয়ও বহন করছেন তিনি।
বর্তমানে ৪৫ বছর বয়সী হামিদ মিয়ার দুই সন্তান। বড় মেয়ে নার্সিংয়ের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছে। তার পড়াশোনার জন্য প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার টাকা এবং প্রতি সেমিস্টারে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। অন্যদিকে, ছেলে মাদরাসায় পড়াশোনা করছে, যার জন্য প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ হয়।
নিজের পথচলার গল্প বলতে গিয়ে হামিদ মিয়া বলেন, শুরুতে অনেক কষ্ট ছিল। ৮০টা হাঁস দিয়ে শুরু করেছিলাম। তখন সংসার চালানো কঠিন ছিল। কিন্তু ধৈর্য হারাইনি। এখন এই খামারই আমার জীবনের ভরসা।

তিনি আরও বলেন, খামারের প্রতিটি কাজে তার স্ত্রী নিয়মিত সহযোগিতা করেন। পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছি।
সিংড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন বলেন, হামিদ মিয়ার মতো উদ্যোক্তারা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সরকারি সহযোগিতা, সহজ ঋণ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. রবিউল ইসলাম বলেন, খোলা মাঠে প্রাকৃতিক খাদ্যনির্ভর হাঁস পালন কম খরচে লাভজনক একটি খাত। নিয়মিত টিকাদান, রোগ প্রতিরোধ এবং সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে এটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই আয়ের অন্যতম উৎস হতে পারে।
প্রতিনিধি/টিবি




