১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
কুমিল্লায় ১৯৭টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ১২৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সের মেয়াদ নেই। তবুও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। এতে চিকিৎসার নামে ব্যবসা, সেবার মান এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রোগী ও তাদের স্বজনদের প্রত্যাশা, কুমিল্লায় চিকিৎসা নিতে এলে উন্নত সেবা পাওয়া যাবে এবং বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্টের মানও ভালো হবে। এমন প্রত্যাশা নিয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নগরীতে আসেন তারা। তবে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর চিকিৎসাসেবা ও পরীক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নগরীর নামকরা কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা যে প্যাথলজিতে করা হয়, তার সামনেই রয়েছে বাথরুম। সেখান থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পরীক্ষার নমুনা দূষিত হতে পারে এবং রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষার রিপোর্টে ভুল আসার আশঙ্কা রয়েছে বলে তাদের দাবি।
কোথাও রক্ত সংগ্রহের সময় বারবার ভুলভাবে সুই প্রবেশ করানোর অভিযোগ রয়েছে, কোথাও পাওয়া যায় না সার্বক্ষণিক কর্তব্যরত চিকিৎসক। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে চিকিৎসাসেবা। ফলে টাকা খরচ করে চিকিৎসা নিতে এসেও স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ভোগান্তির আশঙ্কায় পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনেরা।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, কুমিল্লা সদর ও সদর দক্ষিণ উপজেলায় তালিকাভুক্ত ১৯৭টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ১২৬টির লাইসেন্সের মেয়াদ নেই। অর্থাৎ, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটি অংশের লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনেরা।
রক্ত দিতে গিয়েও ভোগান্তি
রোগীর প্রয়োজনে রক্ত দিতে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রক্তদাতারাও। রক্ত সংগ্রহের সময় বারবার ভুল জায়গায় সুই প্রবেশ করানোর অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন। তাদের অভিযোগ, এমন অভিজ্ঞতা শুধু অস্বস্তিকর নয়, চিকিৎসাসেবার মান ও দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
রক্ত দিতে আসা জান্নাতুল ফেরদৌস কলি বলেন, ‘অদক্ষ লোক দিয়ে রক্ত নেওয়া হচ্ছে। আমার হাতে তিন জায়গায় সুই ঢুকিয়ে রক্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরও পারেনি। পরে আরেকজন মহিলা এসে রক্ত সংগ্রহ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।’
গোলাম হাসনাঈন বলেন, ‘কুমিল্লার বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অবস্থা খুবই খারাপ। এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে। এতে সেবা নিতে আসা রোগীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। টাকা দিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে বরং স্বজনদের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ভয় তৈরি হয়।’
চিকিৎসক না থাকায় অপেক্ষা
কুমিল্লার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কর্তব্যরত চিকিৎসকের অনুপস্থিতির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে রোগী আসার পর অনকল চিকিৎসককে ডেকে আনা হয়। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীরা কত দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জহিরুল ইসলাম আজিম নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘কুমিল্লায় এসেছি ভালো সেবা পেতে। অথচ এসে চিকিৎসক পাওয়া যায় না। রোগী হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসককে কল করা হয়। চিকিৎসক আসতে এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এতে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় অপেক্ষা করতে করতে রোগীর অবস্থাও খারাপ হয়ে যায়।’
পিত্তথলির পাথর অপারেশনে বিল দুই লাখ টাকা
বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচের অভিযোগও করেছেন রোগীরা। অটোরিকশাচালক মো. ইলিয়াস জানান, পরিচিত এক আন্টির মাধ্যমে নগরীর কান্দিরপাড় এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার পিত্তথলির পাথরের অস্ত্রোপচার করান। এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর তার বিল আসে দুই লাখ টাকা।
ইলিয়াস বলেন, ‘আমাকে অনেকে বলেছেন, পিত্তথলির পাথর অপারেশন করতে দুই লাখ টাকা নেওয়া অনেক বেশি হয়েছে।’
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস সিভিল সার্জনের
কুমিল্লা সদর ও সদর দক্ষিণ উপজেলার ১৯৭টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ১২৬টির লাইসেন্সের মেয়াদ নেই- জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নথিতে এমন তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লার জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘কুমিল্লায় অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সের মেয়াদ নেই। আবার কিছু হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সও নেই। আমরা তাদের চিঠি ইস্যু করেছি। তা ছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকার বিষয়টিও অনেকের কাছ থেকে জেনেছি। আমরা এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবার নামে অনিয়ম বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত নজরদারি জোরদার করবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম পাওয়া যাবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে রোগী ও তাদের স্বজনদের প্রত্যাশা, শুধু চিঠি ইস্যু বা ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসের মধ্যে যেন কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না থাকে। লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকা, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সেবার মান নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।