Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

ডিএনএ ল্যাব নেই কক্সবাজারে, ১০ মরদেহ হস্তান্তরে সময় লাগবে দুই সপ্তাহ 

১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ পর্যটকের মরদেহ রাখা হয়েছে জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে। আগুনে মরদেহগুলো এমনভাবে পুড়েছে যে, দেখে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের আগে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

কিন্তু কক্সবাজারে নেই কোনো ডিএনএ ল্যাব। ফলে মরদেহগুলো তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানা গেছে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল থেকে নিহতদের স্বজনেরা হাসপাতালের মর্গের সামনে অপেক্ষা করছেন। প্রিয়জনের নিথর দেহ একনজর দেখা ও শেষবারের মতো কাছে পাওয়ার আকুতি তাদের। সবার মধ্যে উৎকণ্ঠা ও কান্নার রোল।

কিন্তু কক্সবাজারে ডিএনএ পরীক্ষার ল্যাব না থাকায় ঢাকা সিআইডি অপরাধ বিভাগের ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে মরদেহগুলো হস্তান্তর করতে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সদর হাসপাতাল সূত্র। 

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, নিহত ১০ জনের মধ্যে সাতজনের পরিবারের সঙ্গে পুলিশ যোগাযোগ করতে পেরেছে। তাদের স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। 

তিনি বলেন, আগুনে নিহতদের মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে, কোনটি কার মরদেহ তা দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই যেসব পরিবার প্রাথমিকভাবে মরদেহ শনাক্ত করেছে, তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

S

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, দগ্ধ ও বিকৃত মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। কক্সবাজারে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ল্যাব ও যন্ত্রপাতি না থাকায় নমুনা ঢাকার সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবে পাঠাতে হচ্ছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। 

তিনি আরও বলেন, পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মরদেহগুলো হাসপাতালের মর্গেই সংরক্ষণ করা হবে। 

এদিকে নিহতদের স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রিয়জনের মরদেহ শনাক্ত করতে না পারার যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের অপেক্ষা। 

সামুশুদ্দোহা নামের এক স্বজন বলেন, শিশুসহ তার পরিবারের চারজনের মরদেহ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছোট শিশুটির হাতে ব্যাটারিচালিত একটি খেলনা থাকায় তিনি শিশুটিকে শনাক্ত করতে পেরেছেন। তবে অন্যদের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার পর নিশ্চিত হবে। নিহতদের স্মৃতি মনে করে কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। 

এখন পর্যন্ত যাদের পরিচয় জানা গেছে তারা হলেন- ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং তার পাঁচ বছর বয়সি ছেলে ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে দুজন নারী, একজন শিশু ও একজন পুরুষ। 

S

নিখোঁজ একই পরিবারের চারজন 

অগ্নিকাণ্ডের পর যশোরের একই পরিবারের চারজনেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তারা হলেন—নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাদের দুই মেয়ে রোবাইনা (৭) ও সুনাইনা (৩)।

গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের রিসোর্টের ২০২ নম্বর কক্ষে থাকার বুকিং ছিল। নিহতদের তালিকায় তাদের নাম না থাকলেও শনিবার রাত পর্যন্ত তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে তারা অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন কি না, তা নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। 

নাহিদুর রহমান যশোরের মণিরামপুরের মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে। তিনি ঢাকার শ্যামলীর গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন। 

নিখোঁজ নাসরিনের খোঁজে স্বামী 

অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে ঢাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তারেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। দুই বান্ধবী আইরীন জাহান ও ইসরাত জাহানের সঙ্গে বৃহস্পতিবার টুপটুপ রিসোর্টে উঠেছিলেন তিনি। 

আইরীন জাহান জানান, শনিবার ভোরে তারা সূর্যোদয় দেখতে সমুদ্রসৈকতে যান। নাসরিনকে সঙ্গে যেতে বললেও তিনি ঘুমানোর জন্য রিসোর্টে থেকে যান। কিছুক্ষণ পর তারা ফিরে এসে দেখেন রিসোর্টে আগুন জ্বলছে। 

খবর পেয়ে শনিবার বিকেলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ছুটে আসেন নাসরিনের স্বামী দেওয়ান ফয়সাল। তিনি ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি। ছয় বছর আগে নাসরিনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। নাসরিন আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। 

দেওয়ান ফয়সাল বলেন, ‘টুপটুপ রিসোর্টে ছুটে গিয়েও নাসরিনকে পেলাম না। হাসপাতালে লাশের যে অবস্থা দেখলাম, কারও পরিচয় শনাক্ত করার উপায় নেই। পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ টেস্ট লাগবে। 

S

অবৈধ স্থাপনা, ছিল না অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছাড়াই রিসোর্টটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে প্রশাসন। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন বলেন, রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। সেখানে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই পাওয়া যায়নি। 

তিনি বলেন, কাঠের তৈরি স্থাপনাটিতে সমুদ্রের তীব্র বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, রিসোর্টটি অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি অপসারণের জন্য কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরিবেশ অধিদফতরও সম্প্রতি সেখানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেছিল। 

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টি তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি শনিবার (১৭ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

মালিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা 

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার রাতে উখিয়া থানায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর আহমদ (তানভীর সুলতান মিয়া), তার ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদ, রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনসহ চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় আরও ১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। 

ঘটনার পর রিসোর্টের মালিক আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে শনিবার (১৭ অক্টোবর) রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। 

ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটক নিহত হন। দগ্ধ হন আরও ছয়জন। তাদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য উড়োজাহাজে ঢাকায় পাঠানো হয়। বাকি দুজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। 

প্রতিনিধি/এএইচ