Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

১১ মাস আগে পুলিশ সুপারকে প্রাণনাশের শঙ্কা জানিয়েছিলেন সাংবাদিক আলিফ

জেলা প্রতিনিধি

১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

‘এই আসামিদের যদি ধরা না হয়, তবে সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি- হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, না হয় তাদের চেয়ে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে। এই সিদ্ধান্তটা এখন আপনাদের নিতে হবে।’ ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর নেত্রকোনার তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলামের সামনে এভাবেই নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। 

সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রায় ১১ মাস পর দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান সেই সাংবাদিক। ওই সময়ে মতবিনিময় সভায় দেওয়া আলিফের বক্তব্য আজ (১৭ অক্টোবর) সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।  

গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার উতরাইল বাজার এলাকায় গুলিতে নিহত হন আলিফ। তার মৃত্যুর পর প্রায় ১১ মাস আগে পুলিশ সুপারের সামনে দেওয়া নিরাপত্তার আকুতির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা প্রকাশ্যে জানানোর পরও তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং যাদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, তাদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর জেলা পুলিশ সুপারের যোগদান উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরেছিলেন আলিফ। পরে তিনি একবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।

সভায় উপস্থিত থাকা অবস্থায়ও তার কাছে বার্তা আসছিল, সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা বাইরে অপেক্ষা করছে। তাদের কাছে অস্ত্র ও গুলি রয়েছে। সভা শেষে বের হলে তাকে গুলি করা হতে পারে। এ কারণে সেদিন সভা শেষে বাড়িতে ফিরবেন না বলে জানিয়েছিলেন তিনি। কারণ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বাড়ির আশেপাশে তাকে হত্যার জন্য ওঁৎ পেতে রয়েছে বলে জানান তিনি।

সভায় আলিফ বলেছিলেন, ‘আমি অর্গানাইজড ক্রাইম নিয়ে কাজ করি। এই জেলায় দুর্ধর্ষ ও সশস্ত্র যেসব গ্রুপ আছে, তাদের নিউজ আমি করে থাকি। মাদক থেকে শুরু করে সব। এই জেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা। এখানে চোরাচালানের সঙ্গে সংঘবদ্ধ আটটি গ্রুপ আছে। তারা অস্ত্র বহন করে। ককটেল, বিস্ফোরক, মাদকসহ সবকিছুই করে তারা।’

এসব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তৎকালীন পুলিশ সুপারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই আসামিদের যদি ধরা না হয়, তবে সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি- হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, না হয় তাদের চেয়ে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে। এই সিদ্ধান্তটা এখন আপনাদের নিতে হবে।’

নিজের পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন আলিফ। বলেছিলেন, সন্তানের জন্মের কারণে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানেও হামলা ও অগ্নিসংযোগের আশঙ্কা ছিল তার। আগের দিনও সেখানে আগুন দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন তিনি।

অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের কারণে নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে সভায় জানিয়েছিলেন আলিফ। প্রকাশ্যে পুলিশ সুপারের সামনে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি প্রতিকার চেয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তার সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়। দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারাতে হয় তাকে।

আলিফের মৃত্যুর পর এখন সামনে এসেছে তার সেই বক্তব্য। একজন সাংবাদিক প্রকাশ্যে প্রাণনাশের আশঙ্কা জানিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিরাপত্তা চাওয়ার পরও কীভাবে তাকে হত্যার শিকার হতে হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তার অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না, অভিযুক্তদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তারে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং তাকে কিংবা তার পরিবারকে কোনো নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চান সংশ্লিষ্টরা।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আলিফের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং তার আগের অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্তের দাবি উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া আটটার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার উতরাইল বাজারে তাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এতে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় পুলিশ। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা যায়- আলিফকে সামনে থেকে ছয়টি গুলি করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল, যা ময়নাতদন্তের সময় উদ্ধার করা হয়েছে।

শুক্রবার বিকালে ময়নাতদন্ত শেষে কলমাকান্দায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। 
 
নিহত আলিফ ফকির বেসরকারি আইপিটিভি (ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিভিশন) চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি।

তার চার বছর বয়সী একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। 

এ ঘটনায় শুক্রবার রাতেই আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। তবে আজ শনিবার পর্যন্ত হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। হত্যায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

হত্যার আশঙ্কার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে জেলা পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলামের মোবাইলে কল দেওয়া হলেও তিনি কেটে দেন। তবে হোয়াটসঅ্যাপে জানতে চান বিষয় কি? আগের ধারণ করা আলিফের নিরাপত্তা ঝুঁকির ভিডিও পাঠিয়ে বক্তব্য চাইলে তিনি মেসেজ দেখেও কোনো জবাব দেননি।

তবে এ বিষয়ে জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম বলেন, আলিফের করা ডিজি এবং বর্তমানে তার হত্যাকাণ্ডসহ সকল বিষয় গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ, এসআরবিসহ একাধিক সংস্থা কাজ করছে। 

এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ ফকির। ওই সময় তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। হামলায় বাধা দিতে গেলে তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মীকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করেছিল হামলাকারীরা।