Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

সাতক্ষীরায় শামীম হত্যা: ভিডিওতে শনাক্তদের নিয়ে কী বলছে বিএনপি-জামায়াত

জেলা প্রতিনিধি

১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও বিশ্লেষণ করে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করা দাবি উঠেছে। এসব ভিডিওতে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত কয়েকজনকে ঘটনাস্থলে, মিছিলের সামনে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে ভিডিওতে উপস্থিত থাকা আর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। কে কী ভূমিকা রেখেছেন, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার শামীমকে প্রথমে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পরও হামলার ঘটনা ঘটে। স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের একটি অংশ তাকে হাসপাতালের ভেতর থেকে বের করে বাইরে নিয়ে মারধর করে। পরে তার মৃত্যুর খবর ও ঘটনার বিভিন্ন ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও পর্যালোচনার ভিত্তিতে জানা গেছে, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের ফজলুল হক আমিনী তার ‘Fh Ameni’ নামের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে লোকজনকে জড়ো করতে দুই দফা লাইভ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে করা একটি লাইভে কুলিয়ার একটি পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে শামীমকে রাস্তায় ফেলে মারধরের দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে ফজলুল হক আমিনীকে শামীমের বুকের ওপর পা দিয়ে আঘাত করতে দেখা গেছে বলে ভিডিও পর্যবেক্ষণে দাবি করা হয়েছে। একই সময় পারুলিয়া ইউনিয়নের যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত সাদিকুল ইসলামকেও শামীমের বুকে পা দিয়ে আঘাত করতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ওই স্থানে আরও কয়েকজনকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে জামায়াতের যুব বিভাগের সঙ্গে যুক্ত আজহারুল ইসলাম ছিলেন বলে প্রতিবেদকের ভিডিও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। তবে কারও উপস্থিতি বা ভিডিও ধারণের বিষয়টি এককভাবে তাকে হামলায় অংশগ্রহণকারী প্রমাণ করে না।

এ সময় কুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি সাদেকুল ইসলাম শামীমকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করেন বলে বর্ণনায় উঠে এসেছে।

Wahiduzzaman_Shamim_beaten_to_death_in_Debhata_Satkhira_1একই দিন সন্ধ্যায় ‘Md Azharul Satkhira’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ২৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের একটি লাইভ প্রচার করা হয় বলে জানা গেছে। ওই লাইভের শুরুতে পারুলিয়া বাজার এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হতে দেখা যায়। মিছিলটি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে হয়েছে বলে ভিডিও পর্যবেক্ষণে দাবি করা হয়েছে।

মিছিলে আমিনীর পাশাপাশি পারুলিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম রসুল, সাদিকুল ইসলাম, জামায়াতের আইবিডব্লিউএফ শাখার সদস্য হিসেবে পরিচিত মিজানুর রহমান মিজান, যুব বিভাগের আজহারুল ইসলাম এবং শিবিরকর্মী হিসেবে পরিচিত জাবীর আকরামকে স্লোগান দিতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

মিছিলটি পরে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দিকে যায়। ভিডিওর বর্ণনা অনুযায়ী, হাসপাতালের প্রাঙ্গণে প্রবেশের পর স্লোগান জোরালো হয়। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা বাধা দেন। এ সময় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে আনসার সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদকের ভিডিও পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ফজলুল হক আমিনী কয়েকজনকে হাসপাতালের দুটি প্রবেশপথে অবস্থান নিতে নির্দেশ দেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এর কিছু সময় পর হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে শামীমকে শয্যা থেকে বারান্দায় এনে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে হামলাকারীদের একটি অংশ সরে যায় বলে বর্ণনায় বলা হয়েছে।

Wahiduzzaman_Shamim_beaten_to_death_in_Debhata_Satkhira_3ঘটনার আগে ও চলাকালে ‘Md Azharul Satkhira’, ‘Serajul Live’, ‘Fh Ameni’ এবং ‘SD Sadikul Islam’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভ প্রচার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে এসব ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ কপি, সময়ের ধারাবাহিকতা এবং মূল উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। মামলা হওয়ার পর কয়েকজন তাদের ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও বা লাইভ মুছে দিয়েছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।

ভিডিওতে জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মীকে দেখা যাওয়ার বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এইচএম এমদাদুল হকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ভিডিওতে যাঁদের দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন; তবে সবাই মারধরের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন, এমন নয়।

তার ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ায় এলাকার কিছু তরুণ কৌতূহলবশত সেখানে গিয়েছিলেন। তারা কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন, কেউ পরিস্থিতি দেখতে বা জানতে চেয়েছিলেন। তবে সরাসরি মারধরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে তিনি আলাদা করে দুজনের নাম উল্লেখ করেন।

এইচএম এমদাদুল হক বলেন, ভিডিওতে মারধরে সরাসরি অংশ নিতে দেখা গেছে বলে তার দাবি, এমন দুজন হলেন শফিউল আলম আনিস ও সাদিকুল ইসলাম। তবে তার বক্তব্যে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং তাদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

Wahiduzzaman_Shamim_beaten_to_death_in_Debhata_Satkhira_2এর আগে, ১৫ অক্টোবর রাতে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের এক বিবৃতিতে শামীম হত্যার ঘটনায় সংগঠনের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ভিডিওতে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত কয়েকজনকে দেখা যাওয়ার দাবি এবং সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার উত্তর পেতে প্রত্যেকের ভূমিকা পৃথকভাবে তদন্ত করা জরুরি।

দেবহাটা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শেখ সিরাজুল ইসলামের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি বলেন, ভিডিও ফুটেজে ঘটনাটি দেখা যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকার কিছু তরুণ ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ভিডিওতে থাকা সবার উদ্দেশ্য বা ভূমিকা সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন।

পারুলিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম রসুলকে ভিডিওতে দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ সিরাজুল ইসলাম বলেন, তিনি ভিডিওতে তাকে দেখেছেন। এ বিষয়ে যুবদলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে সাদিকুল ইসলাম বিএনপির সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেন এই বিএনপি নেতা।

শেখ সিরাজুল ইসলাম বলেন, অন্যায়কে কেউ সমর্থন করবেন না। তবে ভিডিওতে উপস্থিতি, রাজনৈতিক পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।

শামীম হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে ফজলুল হক আমিনীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। আমিনী ফেসবুকে সক্রিয় রয়েছেন বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ১৬ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৮ মিনিটে তার প্রোফাইলে একটি পোস্টও দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি নিজের কিছু দেনার কথা জানিয়ে তা পরিশোধের জন্য সহযোগিতা চেয়েছেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকা বা কোনো পোস্ট দেওয়ার তথ্য দিয়ে কারও অবস্থান কিংবা গ্রেপ্তার এড়ানোর কারণ নিশ্চিত করা যায় না। এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য ও সর্বশেষ তদন্তের তথ্য প্রয়োজন।

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, দু'জন ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে । বাকিদের গ্রেফতার করা হবে। আর ঘটনায় জয়িত কে কোন দলের সেটি বিবেচনা না করে অপরাধি হিসেবেই তাদেরকে বিবেচনা করা হবে।

প্রতিনিধি/এএম