জেলা প্রতিনিধি
১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫০ পিএম
কক্সবাজারের ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য ফায়ার সার্ভিস সতর্ক করলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনে রিসোর্টটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে গেছে। দুপুর ১টা পর্যন্ত সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ও আহত সবাই পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রান্নাঘর এবং ওপরের অংশে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। বাঁশ ও কাঠের তৈরি স্থাপনাটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিষয়টি এ ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে।
নিহতদের মধ্যে রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫) রয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, প্রথমে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুপুর ১টার পর রিসোর্টের টয়লেট থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। এর মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ। আহতরা হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনের শরীর প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অপর একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, টুপটুপ রিসোর্টের কোনো অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। গত জুন মাসেও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সেই সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
রিসোর্টটির নিচতলায় রান্নাঘর এবং ওপরের অংশে থাকার ঘর থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। বাঁশ ও কাঠের তৈরি স্থাপনায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন। তিনি বলেন, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এরই মধ্যে রিসোর্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডিসি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ইতিমধ্যে ছয়জনের মরদেহ শনাক্ত করেছেন। আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান জানান, হঠাৎ দরজা খুলে তিনি দেখেন, ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে আছে। পরে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে পাশের নালায় লাফ দিয়ে বের হয়ে আসেন।
তিনি জানান, রিসোর্টটিতে ২৫ থেকে ৩০ জনের মতো পর্যটক থাকতে পারেন। ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে এসে তারা সেখানে উঠেছিলেন। তাদের আরও দুই দিন রিসোর্টটিতে থাকার কথা ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুনের সূত্রপাতের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্ধারকাজ শুরু হয়।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান। তদন্তের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং সতর্ক করার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের কারণে রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে এসব বিষয় যাচাই করে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে।
প্রতিনিধি/জেবি