Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

দফায় দফায় মারধর: দেবহাটায় শামীম হত্যার নেপথ্যে কী?

জেলা প্রতিনিধি

১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠেছিল ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের বিরুদ্ধে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তাকে তুলে দেওয়ার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার কথোপকথনের অডিও। এরপর তাকে ঘিরে তৈরি হয় উত্তেজনা। 

এদিকে, শামীমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রক্ষিতে ফেসবুকে লাইভে এসে লোকজনকে জড়ো করার আহ্বান জানান ফজলুল হক আমিনী। একপর্যায়ে চিকিৎসাধীন শামীমকে চেম্বার থেকে বের করে আবারও মারধর করা হয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পরও হামলা থামেনি বলে অভিযোগ পরিবারের।

দফায় দফায় হামলার পর শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান ৩৮ বছর বয়সী শামীম। তার পরিবারের অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

ঘটনাটি সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার। গত ১৩ অক্টোবর শামীমের মৃত্যুর পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাত পরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভোরে এ মামলার এজাহারনামীয় দুই আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে গ্রেপ্তার করেছে দেবহাটা থানা-পুলিশ। তবে প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীর গ্রেপ্তারের বিষয়ে এ তথ্যের মধ্যে কোনো নিশ্চিত খবর নেই।

ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিও, পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের বক্তব্য, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বর্ণনা এবং পুলিশের বক্তব্য থেকে ঘটনাটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। সেগুলো হলো, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ কীভাবে জনতার ক্ষোভে রূপ নিল, ফেসবুক লাইভে কী বলা হয়েছিল, চিকিৎসাধীন একজন মানুষ কীভাবে বারবার হামলার শিকার হলেন এবং ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের জবাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কী বলছে।

অডিও ছড়ানোর পর উত্তেজনা, ফেসবুক লাইভে লোক জড়ো করার আহ্বান

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শামীম ও তার স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। ওই অডিওতে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য রয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। তবে অডিওটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট, রেকর্ডিংয়ের পরিস্থিতি এবং বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করার তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি।

ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেবহাটার পারুলিয়া এলাকার বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী তার ‘Fh Ameni’ নামের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুই দফায় লাইভ করেন।

প্রথম লাইভটি শুরু হয় বেলা ৩টা ৩১ মিনিটে। ১৯ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের ওই সম্প্রচারে একটি অডিও শোনানো হয়। সেটি শামীমের কথোপকথন বলে দাবি করেন ফজলুল হক। এরপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তার শাস্তির দাবি জানান তিনি। লাইভে শামীমের বাড়ির ঠিকানাও উল্লেখ করা হয়।

একইদিন, বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে দ্বিতীয়বার লাইভে আসেন ফজলুল হক। এবার তিনি লাইভ করেন কুলিয়ার এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে, যেখানে শামীম চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের ওই লাইভে তিনি আশপাশের লোকজনকে চেম্বারের সামনে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান।

লাইভের বক্তব্যে ফজলুল হক শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলেন এবং তাকে প্রশাসনের হাতে তুলে না দিয়ে নিজেরা শাস্তি দেওয়ার কথা বলেন। তিনি চিকিৎসককে শামীমকে বাইরে বের করে দেওয়ার জন্যও চাপ দেন। ভিডিও-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় তার আশপাশে লোকজন জড়ো হতে থাকেন। পরে সেখানে কয়েক শ মানুষের সমাগম হয় বলে বর্ণনায় উঠে এসেছে।

এই বক্তব্য ও আহ্বান ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে: অভিযোগ ওঠার পর শামীমকে আইনি প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করার পরিবর্তে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবি প্রকাশ্যে জানানো হয়েছিল।

তবে ফেসবুক লাইভের বক্তব্য, উপস্থিত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং হামলায় কার কী ভূমিকা ছিল, এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসকের চেম্বার থেকে হাসপাতালে, তারপরও থামেনি হামলা

শামীমের পরিবারের অভিযোগ, অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা হয়। বাড়ির দরজা ও দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন তার বড় ভাই আবদুল জলিল সানা।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শামীমের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা ছিল। কখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন, আবার কখনো অসংলগ্ন আচরণ করতেন। স্বজনদের দাবি, এলাকার অনেকেই তার অসুস্থতার বিষয়টি জানতেন।

আবদুল জলিলের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম দফার উত্তেজনার পর শামীমকে কুলিয়া পশ্চিম বাজারের একটি পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হয়। পরদিন বিকেলে সেখানে আবার হামলা হয়। একদল লোক তাকে চেম্বার থেকে বের করে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পুলিশ খবর পেয়ে শামীমকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, সেখানেও হামলা হয়। তাকে মারধরের পর হাসপাতাল থেকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলেও প্রকাশিত বর্ণনায় বলা হয়েছে।

দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মো. সাইফুল ইসলামের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শতাধিক লোক হাসপাতালে ঢুকে শামীমকে মারধর করে। পরে তাকে বাইরে নিয়ে আবার মারধর করা হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয় বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়, পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পরও কীভাবে হামলাকারীরা চিকিৎসাস্থলে প্রবেশ করতে পারলেন? হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে কারা ছিলেন, হামলার সময় পুলিশ ও আনসার সদস্যদের অবস্থান কোথায় ছিল এবং তাদের উপস্থিতিতে কী ঘটেছিল, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

‘আমার ভাইয়ের বিচার চাই’

শামীমের ভাই আবদুল জলিল সানা বলেন, তার ভাইকে ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

শামীমের আরেক স্বজন এস এম জুবায়েরও ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বিচার দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, ফেসবুক থেকে প্রচারিত বক্তব্য ও আহ্বানের পরিণতিতে শামীমের মৃত্যু হয়েছে বলে তারা মনে করেন। তবে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারিক সত্যতা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

শামীমের স্ত্রী মোছা. নাজমা খাতুন বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মাঝেমধ্যে ঝগড়া হলেও পরে তা মিটে যেত। তার দাবি, শামীম মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তাদের দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সুষ্ঠু বিচার এবং সন্তানদের দায়িত্বের বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

শামীমের বন্ধু মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, তারা দুজনই ঢাকায় পড়াশোনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শামীমের পড়াশোনা ও যোগ্যতা ছিল এবং তিনি একটি বইও লিখেছিলেন। বন্ধুর মতে, মানসিক অসুস্থতার কারণে কখনো অসংলগ্ন কথা বললেও তাকে এভাবে মারধর করে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

শামীমের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। পাশাপাশি মাদ্রাসায়ও পড়েছেন এবং হোমিওপ্যাথি বিষয়ে শিক্ষা নিয়েছিলেন বলে স্বজনেরা দাবি করেছেন। তার স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে।

তবে শামীমের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবিগুলো পরিবারের বক্তব্যের ভিত্তিতে এসেছে। এ বিষয়ে চিকিৎসার নথি, চিকিৎসকের মূল্যায়ন বা অন্য স্বাধীন তথ্য পাওয়া গেলে তা দিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা সম্ভব হবে।

অভিযুক্ত ফজলুল হকের বক্তব্য কী?

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফজলুল হক আমিনীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মারধর করা অপরাধ। তবে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে শরিয়তের বিধান ভিন্ন বলে মন্তব্য করেন তিনি। অতীতে এ ধরনের ঘটনায় প্রশাসনের পদক্ষেপে সন্তুষ্ট নন বলেও জানান।

তিনি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, ধর্ম, কোরআন ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কেউ বিরূপ মন্তব্য করলে তিনি প্রতিবাদ করতে এগিয়ে যান। এ ধরনের ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

তবে তার ফেসবুক লাইভে প্রশাসনের হাতে শামীমকে তুলে না দিয়ে নিজেরা শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানানোর যে বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, সেটি তার পরবর্তী বক্তব্যের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলনা করার বিষয়। অভিযোগের বিচার আদালতে হওয়ার আগে কাউকে শাস্তি দেওয়ার আহ্বান এবং জনতার হাতে তুলে দেওয়ার চাপ, এসবের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এই প্রতিবেদনের জন্য ফজলুল হকের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও তার নিজের বক্তব্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

জামায়াতের সম্পৃক্ততা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। শামীমের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের দাবি, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা ছিলেন। তাদের কেউ কেউ ফজলুল হকের নেতৃত্বে লোকজন জড়ো হওয়ার অভিযোগ করেছেন।

তবে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পর্কের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা ছাড়া নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা যায় না। ভিডিওতে কাউকে দেখা গেলেই হামলায় তার ভূমিকা প্রমাণিত হয় না; সেটি তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।

দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এইচ এম ইমদাদুল হক শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় দলকে জড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কোনো স্তরের নেতাকর্মী এ ঘটনায় জড়িত নন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংগঠনটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা সমর্থনযোগ্য নয়; কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল।

অতএব, হামলায় জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার প্রশ্নটি এখনো তদন্তসাপেক্ষ। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিচয়, ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি এবং হামলায় তার নির্দিষ্ট ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।

মামলায় ১০ জনের নাম, গ্রেপ্তার দুই

শামীমের ভাই আবদুল জলিল সানার করা মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভোরে মামলার এজাহারনামীয় দুই আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে গ্রেপ্তার করে দেবহাটা থানা-পুলিশ। মোক্তার হোসেন সুবর্ণাবাদ গ্রামের মৃত মাহতাব উদ্দিন খানের ছেলে। আসাদুল ইসলাম মোল্যা নাজিরের ঘের গ্রামের রহিম বক্স মোল্লার ছেলে।

এর আগে প্রকাশিত তথ্যে দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন জানিয়েছিলেন, পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সংরক্ষণ করেছে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। ফজলুল হক আমিনীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডও পর্যালোচনা করা হচ্ছিল বলে জানান তিনি।

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, দুইজন গ্রেফতার হয়েছে, বাকিদের গ্রেফতার করা হবে। আর ঘটনায় জয়িত কে কোন দলের সেটি বিবেচনা না করে অপরাধী হিসেবেই তাদেরকে বিবেচনা করা হবে।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো প্রয়োজন

শামীমের মৃত্যু শুধু ধর্ম অবমাননার অভিযোগের পরিণতি নয়; ঘটনাটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ানো এবং চিকিৎসাধীন ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার অভিযোগও সামনে এনেছে।

ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

#শামীমের কথোপকথনের অডিও কে রেকর্ড করেছিলেন, কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়ল এবং অডিওটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট কী?
#ফেসবুক লাইভে লোকজনকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানোর পর কারা ঘটনাস্থলে আসেন এবং তাদের মধ্যে কারা সরাসরি হামলায় অংশ নেন?
#পল্লিচিকিৎসকের চেম্বার ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামলার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা কী ছিল?
#শামীমকে হাসপাতাল থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা কীভাবে ঘটল এবং তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ময়নাতদন্তে কী উঠে এসেছে?
#মামলায় নাম থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা কী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ কাদের শনাক্ত করেছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে পুলিশি তদন্ত, ভিডিও ও ডিজিটাল তথ্যের যাচাই, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি, চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের নথি এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ওপর।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আইন ও বিচারব্যবস্থার। কোনো অভিযোগই কাউকে গণপিটুনি দেওয়ার বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামলার বৈধতা দেয় না। শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে শুধু হামলাকারীদের শনাক্ত করাই নয়, উত্তেজনা ছড়ানো, লোকজনকে জড়ো করা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার সম্ভাব্য ব্যর্থতার প্রতিটি দিকও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।