জেলা প্রতিনিধি
১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
ধানের মাঠই যখন পাঠশালা, আর ধানের গাছগুলোই যখন শিক্ষার উপকরণ তখন কৃষকের শেখার সুযোগও হয়ে ওঠে ব্যতিক্রমী। দিনাজপুরের হুগলীপাড়া গ্রামে একই মাঠে চাষ করা হয়েছে ৫২ জাতের আমন ধান। পাশাপাশি বেড়ে ওঠা এসব ধানের বৈশিষ্ট্য সরাসরি দেখে উপযোগী জাত সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন কৃষকেরা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এই উদ্যোগে গবেষণার জ্ঞান পৌঁছে যাচ্ছে কৃষকের মাঠে, তৈরি হচ্ছে উন্নত ধান চাষের নতুন সম্ভাবনা।
দিনাজপুর সদর উপজেলার ৫ নম্বর শশরা ইউনিয়নের হুগলীপাড়া গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যতিক্রমী এই ‘রাইস গার্ডেন’। দুই বছর আগেও সাধারণ গ্রাম হিসেবে পরিচিত এই জনপদ এখন স্থানীয় কৃষকদের কাছে ‘প্রযুক্তিগ্রাম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ব্রি উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের ধান সম্পর্কে কৃষকদের বাস্তব ধারণা দেওয়া এবং উন্নত জাতের চাষে উৎসাহিত করতেই নেওয়া হয়েছে এ উদ্যোগ।

সরেজমিনে দেখা যায়, দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই হুগলীপাড়া গ্রাম। মহাসড়ক থেকে গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দুই পাশে সবুজ ধানের মাঠ। মাঠের বিভিন্ন অংশে সারি সারি করে চাষ করা হয়েছে ৫২ জাতের আমন ধান। প্রতিটি জাতের জমিতে ধানের নাম ও পরিচিতি তুলে ধরে দেওয়া হয়েছে সাইনবোর্ড।
এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে ব্রির দিনাজপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে চলতি আমন মৌসুমে এই রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য উন্নত ও উচ্চফলনশীল ধানের জাত এবং আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সহজভাবে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন জাতের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বাস্তব ধারণা তৈরি করে তাদের উপযোগী জাত নির্বাচনে সহায়তা করা।
রাইস গার্ডেনে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা ধানের গাছগুলো পর্যবেক্ষণ করে কৃষকেরা জাতভেদে গাছের উচ্চতা, বৃদ্ধি, শীষের গঠন, রোগবালাই সহনশীলতা, ফলনক্ষমতা ও গুণগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা নিতে পারছেন। ফলে শুধু অন্যের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর না করে সরাসরি মাঠে দেখে ধানের জাত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাদের।
নতুন জাতের ধান চাষে আগ্রহী কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে ব্রি। রাইস গার্ডেন পরিদর্শনের পাশাপাশি কৃষকেরা পাচ্ছেন হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ। বীজ সরবরাহ এবং জমি প্রস্তুতিতেও সহযোগিতা করা হচ্ছে। এতে প্রদর্শনীতে দেখা জাতগুলো নিজেদের জমিতে চাষের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

ব্রি সূত্রে জানা গেছে, রাইস গার্ডেনে বিআর-৩, বিআর-৪, বিআর-৫, বিআর-১০, বিআর-১১, বিআর-২২, বিআর-২৩ ও বিআর-২৫ জাতের ধান রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ব্রি ধান-৩০, ব্রি ধান-৩১, ব্রি ধান-৩২, ব্রি ধান-৩৩, ব্রি ধান-৩৪, ব্রি ধান-৩৭, ব্রি ধান-৩৮, ব্রি ধান-৩৯, ব্রি ধান-৪০, ব্রি ধান-৪১, ব্রি ধান-৪৪, ব্রি ধান-৪৬, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৫১, ব্রি ধান-৫২, ব্রি ধান-৫৩, ব্রি ধান-৫৪, ব্রি ধান-৫৬, ব্রি ধান-৫৭, ব্রি ধান-৬২, ব্রি ধান-৬৬, ব্রি ধান-৭০, ব্রি ধান-৭১, ব্রি ধান-৭২, ব্রি ধান-৭৩, ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৭৬, ব্রি ধান-৭৭, ব্রি ধান-৭৮, ব্রি ধান-৭৯, ব্রি ধান-৮০, ব্রি ধান-৮৭, ব্রি ধান-৯০, ব্রি ধান-৯১, ব্রি ধান-৯৩, ব্রি ধান-৯৪, ব্রি ধান-৯৫, ব্রি ধান-১০৩, ব্রি ধান-১০৯, ব্রি ধান-১১০, ব্রি ধান-১১১ ও ব্রি ধান-১১২। পাশাপাশি রয়েছে ব্রি হাইব্রিড ধান-৪ ও ব্রি হাইব্রিড ধান-৬।
কৃষক আবু সাঈদ বলেন, ব্রির মাধ্যমে ধান চাষ সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে পারছি। ধানের বীজ, সারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা পাচ্ছি। এবার আমি জিরা-৩৪, কাঠারি ও জিরা-৯০ জাতের ধান চাষ করেছি। ব্রির প্রদর্শনী মাঠে বিভিন্ন জাতের ধান দেখে অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। আগামীতে ব্রি উদ্ভাবিত কোনো একটি জাতের ধান চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তরুণ কৃষক রাকিব বাবু বলেন, আগে বাংলাদেশে কী কী জাতের ধান চাষ হয়, কোন জাতের ধান কীভাবে চাষ করতে হয় এবং কোন ধান কত দিনে পরিপক্ব হয়, সে সম্পর্কে আমাদের তেমন ধারণা ছিল না। এখন আমাদের এলাকাতেই বিভিন্ন জাতের ধান সরাসরি মাঠে দেখে এসব বিষয়ে জানতে পারছি। এতে আগামী বছর নিজের জমিতে কোন জাতের ধান চাষ করব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।
কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, আমাদের এলাকায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এই প্রদর্শনী মাঠ দেখে অনেক কৃষক ধান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এখনো ধানের শীষ বের হয়নি, তবে গাছের বৃদ্ধি ও অবস্থা দেখে কোন জাতের ধান ভালো ফলন দিতে পারে, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। একসঙ্গে ৫২ জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। যেসব জাতের ফলন ভালো হবে, আগামীতে সেগুলোই চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) দিনাজপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ জাহিদ হাসান বলেন, ধান উৎপাদনশীলতা বাড়ানো মানে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা নয়। অল্প জমিতে পরিমিত পানি ব্যবহার, মানসম্মত বীজ প্রয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখাই প্রকৃত লক্ষ্য। ব্রির এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৫টি প্রযুক্তিগ্রামের কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ব্রি উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের ধান কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকেরা নতুন জাত ও প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে পারছেন এবং তাদের দক্ষতাও বাড়ছে।
এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৫টি গ্রামকে আদর্শ প্রযুক্তিগ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। একদিকে স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষি পরিস্থিতি বিবেচনায় ধানের জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে, অন্যদিকে অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবনেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের আওতায় ব্রি-১১৬, ব্রি-১১৭ ও ব্রি হাইব্রিড ধান-১০ অবমুক্ত করা হয়েছে। ব্রি-১১৭ ও ব্রি হাইব্রিড ধান-১০ লবণাক্ততা সহনশীল। এ ছাড়া ব্রি-১১৮ নামে একটি নতুন জাত অবমুক্ত করা হয়েছে, যা হাওর অঞ্চলে জনপ্রিয় করতে কাজ চলছে। প্রতিবছর আগাম বন্যায় হাওর অঞ্চলে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ব্রি-১১৮ আগাম রোপণ ও আগাম কাটার উপযোগী হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকেরা উপকৃত হতে পারেন। এ প্রকল্পের আওতায় আরও বিভিন্ন কৃষি প্রযুক্তি ও ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
প্রতিনিধি/টিবি