১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
ভুল হাতে ফিজিওথেরাপি নিয়ে সুস্থ হওয়ার বদলে রোগীরা আরও জটিল শারীরিক সমস্যায় পড়ছেন। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় কারও কারও স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। অথচ ঢাকার সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রকে (সিআরপি) ঘিরে গড়ে ওঠা একের পর এক ফিজিওথেরাপি সেন্টারে রোগী দেখছেন প্রয়োজনীয় ডিগ্রিবিহীন ভুয়া চিকিৎসকেরা।
কেউ স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে, আবার কেউ স্রেফ টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেই নিজেকে ‘ফিজিওথেরাপিস্ট’ পরিচয় দিয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। মূলত, রোগীদের আস্থার জায়গা সিআরপির নাম ও সুনামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেই সাভারে অবাধে চলছে এসব নামসর্বস্ব চিকিৎসাকেন্দ্রের অপতৎপরতা।
অনুসন্ধানে এমন একজনের সন্ধান পাওয়া গেছে, যিনি এসএসসি পাসের পর সিআরপিতে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন। অথচ এখন তার ভিজিটিং কার্ডে ইংল্যান্ড ও কানাডার একাধিক উচ্চতর ডিগ্রির উল্লেখ রয়েছে। তার নাম ফরহাদ হুসাইন।
সিআরপির প্রধান ফটকের কাছেই ‘ইউনিক রিহ্যাব সলিউশন’ নামে একটি ফিজিওথেরাপি সেন্টার পরিচালনা করছেন ফরহাদ। রোগীদের দেওয়া তার ভিজিটিং কার্ডে লেখা রয়েছে, ইংল্যান্ড থেকে তিনি ‘মেকানিক্যাল ডায়াগনোসিস অ্যান্ড থেরাপি ফর মাসকুলোস্কেলিটাল’, ‘অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট অব ব্যালান্স প্রবলেম’ এবং ‘স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশন’-এর ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। কানাডা থেকেও একটি উচ্চতর ডিগ্রির উল্লেখ রয়েছে কার্ডে।
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব কোনো ডিগ্রিই ফরহাদের নেই। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পর্যন্ত। বিদেশেও কখনো যাননি।
তবে ফরহাদের দাবি, বাংলাদেশে বসেই বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কোনোটি তিন দিনের, কোনোটি সাত দিনের।
আরও সেই প্রশিক্ষণগুলোর পরিচয়ই ভিজিটিং কার্ডে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সেগুলো বিদেশি ডিগ্রি। এদিকে, সব প্রশিক্ষণের সনদও তিনি দেখাতে পারেননি।
ভুল স্বীকার ফরহাদের
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফরহাদ হুসাইন একপর্যায়ে স্বীকার করেন, তার ভিজিটিং কার্ডে তথ্যগুলো সঠিকভাবে লেখা হয়নি। কার্ডে উল্লেখ করা বিষয়গুলো সংশোধন করবেন বলেও জানান তিনি।
তবে এরই মধ্যে ওই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখছেন। শুধু সেন্টারেই নয়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হোম পেশেন্টও দেখেন বলে জানা গেছে।
_20261010_172839439.jpg)
নিজের পক্ষে বক্তব্য দিতে ফরহাদ তার অধীনে কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট শাহীনুর ইসলামকে সামনে আনেন। তবে ফরহাদের কথিত বিদেশি ডিগ্রির বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি শাহীনুর।
তিনি জানান, চার মাস ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। ফরহাদ সিআরপিতে ১৪ বছর কাজ করেছেন এ কথা তিনি মূলত কার্ডে দেখেছেন এবং অন্যদের কাছ থেকে শুনেছেন।
সিআরপিতে ছিলেন টেকনিশিয়ান
ফরহাদের কর্মজীবনের তথ্য যাচাই করতে কথা বলা হয় সিআরপির ফিজিওথেরাপি বিভাগের সঙ্গে। সেখানের বিভাগীয় প্রধান আনোয়ার হোসাইন জানান, এসএসসি পাসের পর ফরহাদ সিআরপিতে ১৮ মাসের একটি কোর্স করেন। এরপর টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রায় ১৪ বছরের কর্মজীবনে তিনি টেকনিশিয়ান পদেই ছিলেন।
আনোয়ার হোসাইনের দাবি, ফরহাদের বিদেশি ডিগ্রির কোনো ভিত্তি নেই।
তিনি জানান, ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে রোগী মূল্যায়ন ও চিকিৎসার ধরন নির্ধারণের জন্য বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি সম্পন্ন করার পাশাপাশি এক বছরের ইন্টার্নশিপ করতে হয়। অন্যদিকে টেকনিশিয়ানের কাজ মূলত ফিজিওথেরাপি সেবায় সহায়তা করা।
তার ভাষায়, রোগীকে বেড থেকে হুইলচেয়ারে নেওয়া, দাঁড় করানো কিংবা অন্যান্য সহায়ক কাজ টেকনিশিয়ানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি রোগীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করে কী ধরনের থেরাপি প্রয়োজন তা নির্ধারণ করার কথা নয়, তিনি যদি নিজেই ফিজিওথেরাপিস্ট পরিচয়ে রোগী দেখেন তাহলে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি থেকেই যায়।
সিআরপি সড়কে আরও অনিয়ম
অনুসন্ধানে শুধু ফরহাদের প্রতিষ্ঠানেই নয়, সিআরপি এলাকার আরও কয়েকটি ফিজিওথেরাপি সেন্টারে নানা অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। সিআরপি সড়কের একটি ভবনের নিচতলায় ‘নিউ এভারকেয়ার ফিজিওথেরাপি সেন্টার’। প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানটিতে শিশুদের থেরাপি দিচ্ছিলেন রাব্বি শিকদার নামের একজন। তিনি নিজেকে ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু বিএসসি ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে যাকে দেখানো হয়, তিনি তখনো পড়াশোনা করছেন বলে জানান রাব্বি। তার বক্তব্য, অভিজ্ঞতা হয়েছে বলেই তিনি রোগী দেখেন।
রাব্বি বলেন, ওই সেন্টারে বিএসসি ফিজিওথেরাপিস্ট প্রয়োজন এটি তিনি জানেন। তবে সেই ব্যক্তি তখনো শিক্ষার্থী হওয়া অবস্থায় কীভাবে রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
মেয়াদ শেষ লাইসেন্সের, তবুও চলছে প্রতিষ্ঠান
সিআরপি সড়কের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘মা ফিজিওথেরাপি সেন্টার’। শিশু রোগীদের কেন্দ্র করে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ প্রায় তিন বছর আগে শেষ হয়েছে বলে জানা যায়।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মিরাজ হোসেনের কাছে লাইসেন্স ও কর পরিশোধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটে রয়েছে।

তার দাবি, সিআরপি সড়কের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় তাদের সেবাই ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হলো অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি থাকা অবস্থায় এমন প্রতিষ্ঠানে রোগীদের চিকিৎসা নেওয়া কতটা নিরাপদ?
দালাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোগী সংগ্রহ
এসব প্রতিষ্ঠানে রোগী আসার পদ্ধতিতেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। নিউ এভারকেয়ারে পাওয়া রোগীদের স্বজনেরা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও এবং দালালের মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠানটির সন্ধান পেয়েছেন। সেন্টারটির অনুমোদন, চিকিৎসকের যোগ্যতা কিংবা সংশ্লিষ্টদের শিক্ষাগত অবস্থান সম্পর্কে তারা আগে খোঁজ নেননি।
এখানেই বড় ঝুঁকি দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিআরপিতে আসা রোগীদের অনেকেই পক্ষাঘাত, দুর্ঘটনাজনিত শারীরিক অক্ষমতা বা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় ভোগেন। সিআরপির আশপাশে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ও অবস্থানের কারণে অনেকে এগুলোকে সিআরপির সেবা ব্যবস্থার অংশ বলেও ধরে নিতে পারেন।
ভুল থেরাপিতে বাড়তে পারে জটিলতা
সিআরপিতে কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট হারুন অর রশীদের মতে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা ব্যক্তির হাতে রোগীর থেরাপি গেলে চিকিৎসার কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। বরং রোগীর সমস্যার ধরন অনুযায়ী ভুল থেরাপি প্রয়োগ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তার অভিযোগ, টেকনিশিয়ান বা সহায়ক পর্যায়ের কাজ করা ব্যক্তিদের কেউ কেউ এখন ফিজিওথেরাপিস্ট পরিচয় দিচ্ছেন।
হারুন অর রশীদ বলেন, চিকিৎসকদের মতো ফিজিওথেরাপিস্টদেরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নিবন্ধনব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তাহলে কে প্রকৃত ফিজিওথেরাপিস্ট, আর কে নন তা যাচাই করা সহজ হবে।
চিকিৎসা নিতে এসে বাড়ছে ভোগান্তি
সিআরপির ফিজিওথেরাপিস্ট কনসালটেন্ট ফারজানা তাওহিদের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগজনক। তার মতে, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অনেক রোগী সিআরপি আর বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর পার্থক্য বুঝতে পারেন না। দালালদের মাধ্যমে অনেকে আশপাশের সেন্টারে চলে যান। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হলে শেষ পর্যন্ত সিআরপিতে আসেন।
তখন অনেক রোগীর অবস্থা আগের তুলনায় আরও খারাপ থাকে বলে জানান তিনি।
ফারজানা তাওহিদ বলেন, কোনো কোনো রোগী বাইরে দুই-তিন মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর সিআরপিতে আসেন। অথচ শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা পেলে যে সময়ের মধ্যে উন্নতি হওয়ার কথা, ভুল চিকিৎসার কারণে সেই সময়ের মধ্যে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যেতে পারে।
নিয়ন্ত্রণহীন পেশা, বাড়ছে ভুয়া পরিচয়
সংশ্লিষ্ট ফিজিওথেরাপিস্টদের অভিযোগ, বাংলাদেশে চিকিৎসক ও নার্সদের মতো ফিজিওথেরাপিস্টদের পেশাগত নিবন্ধন ও তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে প্রশিক্ষণ, ডিগ্রি ও পেশাগত পরিচয় যাচাই না করেই অনেকে ফিজিওথেরাপি সেবা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল কার্যকর করার দাবি তাই দীর্ঘদিনের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাউন্সিল কার্যকর হলে ফিজিওথেরাপিস্টদের যোগ্যতা যাচাই, নিবন্ধন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণকে ডিগ্রি হিসেবে উপস্থাপন কিংবা টেকনিশিয়ান হয়েও ফিজিওথেরাপিস্ট পরিচয় দেওয়ার প্রবণতাও বন্ধ করা যাবে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিআরপি এলাকার বেসরকারি ফিজিওথেরাপি সেন্টারগুলোর অনুমোদন, কর্মরতদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত পরিচয় দ্রুত যাচাই করা দরকার। পাশাপাশি কার্যকর করতে হবে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল।
প্রতিনিধি/এসআই