Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

আপত্তি সত্ত্বেও মোহনগঞ্জের ১১ স্কুলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান রদবদলের অভিযোগ

জেলা প্রতিনিধি

০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে শিক্ষকদের আপত্তি উপেক্ষা করে ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে রদবদলের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। 

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দাবি, তাঁদের অনাগ্রহ ও দায়িত্ব পালনে অপারগতার বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলেও তা বিবেচনায় না নিয়ে নতুন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ রদবদল করেছেন।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানান, কয়েকটি বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা অসুস্থতা, বয়স, আইসিটি বিষয়ে দক্ষতার ঘাটতি এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ সামলাতে না পারার কারণ দেখিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁরা তৎকালীন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদনও করেন। পরে তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র হলেও আইসিটিতে দক্ষ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম কয়েকজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তবে সম্প্রতি নতুন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই বিদ্যালয়গুলোতে আবারও রদবদল করা হয়েছে। 

শিক্ষা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্বে রদবদল করা বিদ্যালয়গুলো হলো- উপজেলার সাতুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রামপাশা, পশুখালী, দৌলতপুর মডেল, মাইলোরা, সোনারামপুর, বড়তলী, সামাইকোনা, কমলপুর, মাঘান ও সমাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পরিবর্তন করে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ না করে এবং আগের লিখিত আবেদনগুলো বিবেচনায় না নিয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষকদের ভাষ্য, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক নয়, এর সঙ্গে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ, অনলাইনে তথ্য আদান-প্রদান, বিভিন্ন ধরনের তথ্য এন্ট্রি, দাপ্তরিক কাজসহ নানা দায়িত্ব জড়িত। এসব কাজের জন্য কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা প্রয়োজন। কিন্তু জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের অনেকেই এসব কাজে দক্ষ নন। এ ছাড়া অনেকের চাকরির মেয়াদও শেষের দিকে। ফলে এ বয়সে অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ নেওয়া তাঁদের জন্য কঠিন।

পৌরশহরের মাইলোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খায়রুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানিয়ে কর্মকর্তার কাছে লিখিত দিয়েছেন। তারপর সকলে আলোচনা করে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও তিনি এ দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলাম  না।

তিনি আরও বলেন, অন্যান্যদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা, কেউই এ দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন না। কারণ এ দায়িত্বে বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। তবু বিদ্যালয়ের স্বার্থে রাজি হয়েছি। এখন আবার চিঠি দিয়ে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, আমরা অনিয়ম করে দায়িত্বে ছিলাম। বিষয়টা দুঃখজনক।

এ বিষয়ে সমাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক খাতেমুন্নাহার বলেন, আমি নানা রোগে আক্রান্ত। ফলে এসব উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব না নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলাম। তাই অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার আমাকে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এটা আমার জন্য কষ্টকর হবে। তাই শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে কয়েকদিন সময় চেয়েছি।

এছাড়া অন্য সবার মন্তব্যও একইরকম। 

দৌলতপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সেলিম শাহ বলেন, আমি এই বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকেই আমি দায়িত্বে রয়েছি। এখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

তবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ বলেন, কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই বিধি অনুসরণ করেই ১১টি বিদ্যালয়ে রদবদল করা হয়েছে। আমাদের সকল শিক্ষকই যোগ্য। তবে আইটি বা অন্য যেকোনো বিষয়ে তারা অফিসের সহকারীদের সহায়তা নিতে পারেন। 

তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে বাদ দিয়ে অন্যদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান করার নিয়ম নেই। কোনো জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে লিখিতভাবে জানাতে হবে এবং সেইসঙ্গে কেন অপারগ তাঁর দাবির পক্ষে সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্টস যুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র লিখিত আবেদনই যথেষ্ট নয়। অসুস্থ হলে মেডিকেল রিপোর্ট, এছাড়া অন্য কারণ থাকলে সেগুলোর ডকুমেন্টস জমা দিতে হবে। তারপর সেসব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। ঊর্ধ্বতন এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবেন। সারাদেশে একই নিয়ম বলেও জানান তিনি।

শহরের দৌলতপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, অন্যগুলোর মতো ওই স্কুলেও আলোচনার মাধ্যমে একজন জুনিয়কে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল, তবে নিয়মানুযায়ী জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বলছেন, জ্যেষ্ঠতার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাঁদের আশঙ্কা, বিষয়টি পুনর্বিবেচনা না করা হলে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কাজ ও পাঠদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়বে।

প্রতিনিধি/এসআই