Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

এক পায়ে গাছের ডাল কেটেই সংসার চালান রংপুরের একরামুল

০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

একটি পা ভালো থাকলেও অন্য পা টি অচল। তবুও থেমে নেই জীবন। সংসার চালাতে গাছের ডাল-পালা কাটার মতো কঠিন কাজ বেছে নিয়েছেন তিনি। এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে গাছে ওঠেন, কাটেন ডাল-পালা। এভাবেই চলে ৬ জনের সংসার। রংপুর জেলাজুড়ে যাঁকে অনেকেই চেনেন ‘বৃক্ষমানব’ বা ‘ট্রি ম্যান’ নামে। 

তিনি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার দক্ষিণ মদামোদন এলাকার আব্দুল করিমের ছেলে একরামুল। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট একরামুল। তাঁর কাঁধেই এখন বাবা-মাসহ সংসারের দায়িত্ব। এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে গাছের ডালে ওঠা এবং সেটির প্রতিটি পদক্ষেপ যেন জীবনের সঙ্গে তাঁর একেকটি যুদ্ধ।

পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, সুস্থ্য ও সবল হাত-পা নিয়ে জন্ম নেন একরামুল। মাত্র চার বছর বয়সে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে তাঁর একটি পা। ধীরে ধীরে সেটি পঙ্গু হয়ে যায়। এভাবেই কোনমতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে একরামুল। ছোটবেলায় যখন সহপাঠী, প্রতিবেশী আর বন্ধুরা লাফিয়ে লাফিয়ে সুপারি গাছসহ নানা গাছে উঠত, তখন একরামুলের মনেও জাগত গাছে ওঠার প্রবল ইচ্ছা। কিন্তু পঙ্গুত্বের কারণে সেই ইচ্ছা পূরণ করতে না পারার কষ্ট জমে ছিল মনে। সেই আক্ষেপই একসময় পরিণত হয় চেষ্টায়। এক পায়ে ভর করেই শিখে নেন গাছে ওঠার কৌশল। আর সেই দক্ষতাই এখন তাঁর কর্ম ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠছে।

গাছের ডালে রংপুরের একরামুলের জীবনযুদ্ধ / ছবি: ঢাকা মেইল
গাছের ডালে রংপুরের একরামুলের জীবনযুদ্ধ / ছবি: ঢাকা মেইল

প্রতিদিন সকাল হলেই পঙ্গুত্বের বাধা পেছনে ফেলে কাঠের স্ট্রেচারে করে দা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন গাছ ও ডাল কাটার সন্ধ্যানে একরামুল। এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে মানুষের বাড়ি কিংবা বাগানে পৌঁছান। এরপর শুরু হয় জীবন ঝুঁকিতে ফেলে মগডালে উঠে গাছ পরিষ্কারের কাজ।

একেকটি গাছ পরিষ্কার করে পান ২০ থেকে ৫০ টাকা। কখনও কখনও ১০০-২০০ টাকাও পান। সারাদিনে চার থেকে পাঁচশ টাকা আয় হলে তা দিয়ে বাজার করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন একরামুল। এই সামান্য আয়েই চলে বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ ছয় সদস্যের সংসার। অভাবের সংসারে বড় দুই ভাইও বাবা-মাকে তেমন সহযোগিতা করতে পারেন না। তাই পঙ্গুত্বের বোঝা নিয়েও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব এসে পড়েছে একরামুলের কাঁধে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূলতা, কিছুই থামাতে পারে না তাঁর এই লড়াই। কারণ একদিন কাজে বের হতে না পারলে, সেদিনই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে অসহায় পরিবারের খাবার। টানা কয়েকদিন কাজ না থাকলে না খেয়েই থাকতে হয় তাঁদের।  

এদিকে একরামুলের এই অসহায়ত্ব এখন শুধু তাঁর পরিবারের নয়, কষ্ট দেয় পুরো এলাকার মানুষকেও। তাই তাঁর জন্য চান স্থায়ী কর্মসংস্থান। একরামুলের হাতে একটি দা যেটিই তাঁর সম্বল, যেটি দিয়ে প্রতিদিন জীবন-জীবিকার লড়াই চালান। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? বয়স বাড়ছে, শরীরও ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন গাছের ডালে উঠে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে কাজ করাও হয়ে উঠছে কঠিন।

একরামুল বলেন, টানা কয়েক বছর ধরে এই গাছ ও ডালপালা কাটার কাজ করছি। মাঝে খুব ক্লান্ত হয়ে পরি। ক্লান্তির কারণে মাঝে মাঝে পড়ে যেতে ধরি। দুই একদিন বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি। কোনো একদিন পড়ে গেলে হয়তো হাত-পা ভাঙার সঙ্গে মারাও যেতে পারি। তাই বাবা মা, স্ত্রীর কথা চিন্তা করে কাজটি ছেড়ে দিতে চাই। কিন্তু কি আর করা। পঙ্গুত্বের কারণের কেউ কাজ দেয় না। বাধ্য হয়েই এই কঠিন কাজটি করছি। রংপুরের মানুষের কাছে ‘ট্রি ম্যান’ বা বৃক্ষ মানব বলেন, আমি কাজ করেই সংসার চালাতে চাই। আমাকে একটি স্থায়ী কাজের সুযোগ দিলে আমার এই কাজটি আর করতে হতো না। 

ছেলের এমন ঝুঁকিপূর্ণ জীবন দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না বাবা-মা। প্রতিদিন এক পায়ে লাফিয়ে গাছে ওঠা একরামুলকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় কাটে পরিবারের দিন। স্বামীর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী। ভাইয়ের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে চোখে পানি আসে বোনেরও।

একরামুলের স্ত্রী বলেন, প্রতিদিন পঙ্গু পা নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন গাছ কাটার জন্য। গাছে চড়তে খুব কষ্ট হয় তার। একদিন সেই কষ্ট দেখে তাঁকে গাছের ডাল-পালা আর কাটতে দেইনি। কিন্তু কয়েকদিন অন্য কাজের সন্ধ্যান করলেও কোনো কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে আবারো গাছ কাটার কাজ করছে। 

গাছের ডালে রংপুরের একরামুল / ছবি: ঢাকা মেইল
গাছের ডালে রংপুরের একরামুল / ছবি: ঢাকা মেইল

একরামুলের বাবা আব্দুল করিম জানান, গাছ কাটা ও ডাল-পালা কাটা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও শুধু সংসারের কারণে এই পেশাটাকে বেছে নিয়েছেন। আমি অসহায়। কিছু করতে পারি না। বাধ্য হয়ে ছেলের এই কষ্টের ইনকাম খাই। এ সময় ছেলের কষ্টের কথা চিন্তা করে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি এই বাবা।

স্থানীয়দের মতে, কেউ একরামুলকে একটি দোকান-ঘর অথবা চার্জার অটোরিকশার ব্যবস্থা করে দিলে তিনি খুবই উপকৃত হবেন। তাহলে তাঁকে ঝুঁকি নিয়ে আরও এই কাজ করতে হবে না। অন্যদিকে, পরিবারের মুখেও দুমুঠো ভাত সহজে তুলে দিতে পারবেন তিনি।