Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

শতবর্ষ পেরিয়েও স্বাদের জাদুতে অটুট শরীয়তপুরের ‘সালাম হোটেল’

জেলা প্রতিনিধি

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম

বাইরে থেকে দেখলে মনেহয়, খুব সাধারণ একটি খাবারের দোকান। ছোট্ট ঘরটিতে একসঙ্গে বেশি মানুষের বসার জায়গাও নেই। তবু দুপুর গড়াতেই সেখানে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, কেউ অল্প জায়গায় বসে খাচ্ছেন, আবার কেউ খাওয়া শেষে তৃপ্তির হাসি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এই চিত্রই যেন প্রতিদিনের। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা সদরের মাছবাজার গলির এই ছোট্ট খাবারের হোটেলটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘সালাম হোটেল’ নামে। শতবর্ষ পেরিয়েও টাটকা নদীর মাছ আর ঘরোয়া রান্নার স্বাদে আজও ক্রেতাদের টানছে হোটেলটি।

হোটেলটির আনুষ্ঠানিক কোনো নাম নেই। তবে নড়িয়ার মানুষের কাছে ‘সালাম হোটেল’ নামটিই যথেষ্ট পরিচিত। পদ্মা ও কীর্তিনাশা নদীর তাজা মাছ দিয়ে রান্না করা খাবারের জন্য দূরদূরান্ত থেকেও অনেকে এখানে আসেন। ছোট পরিসরের এই হোটেলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস।

হোটেলটির বর্তমান মালিক ৮৪ বছর বয়সী আব্দুস সালাম খান। প্রায় ৫৭ বছর ধরে তিনি বাবার রেখে যাওয়া এই ব্যবসা সামলে আসছেন। এর আগে তার বাবা সুরত আলী খান প্রায় ৪৯ বছর হোটেলটি পরিচালনা করেছেন।

জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২০ সালের দিকে নড়িয়া বাজারে খাবারের হোটেল ব্যবসা শুরু করেন সুরত আলী খান। পদ্মা ও কীর্তিনাশা নদীর তীরঘেঁষা হওয়ায় তখন নড়িয়া বাজারে নদীর মাছের ব্যাপক চাহিদা ছিল। সেই সময় কীর্তিনাশা নদীর ঘাটে ছোট পরিসরে হোটেল চালু করেন তিনি।

পরবর্তীতে বাজারের ভেতর এবং উপজেলা পরিষদের সামনেও হোটেল পরিচালনা করা হয়। ১৯৯০ সালে হোটেলটি স্থানান্তর করা হয় মাছবাজার গলিতে। সেই থেকে একই জায়গায় চলছে ‘সালাম হোটেল’।

১৯৬৯ সালে বাবার কাছ থেকে হোটেল পরিচালনার দায়িত্ব নেন আব্দুস সালাম। বাবার মৃত্যুর পরও তিনি ব্যবসাটি ধরে রাখেন। বয়সের ভার শরীরে এলেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আর পুরোনো ব্যবসার টানেই এখনও প্রতিদিন হোটেলে বসেন তিনি।

সালাম হোটেলে প্রতিদিন বেলা ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খাবার পরিবেশন করা হয়। সরকারি ছুটির দিনে হোটেল বন্ধ থাকে। এখানকার খাবারের মূল আকর্ষণ নদীর টাটকা মাছ। পদ্মার ইলিশ, পাঙাশ, আইড়, বোয়ালসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ রান্না করা হয়। কীর্তিনাশা নদীর ছোট মাছেরও রয়েছে আলাদা চাহিদা। পাশাপাশি থাকে দেশি মুরগি ও খাসির মাংস।

তবে নদীর মাছ না পাওয়া গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেদিন হোটেলই বন্ধ রাখা হয়। কারণ, পুরোনো এই হোটেলের পরিচয়ের সঙ্গে টাটকা নদীর মাছের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

বর্তমানে এক টুকরা ইলিশ বিক্রি হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। পাঙাশ, আইড় ও বোয়ালের এক পিসের দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। ছোট মাছের এক প্লেট ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। খাসি ও মুরগির মাংসের এক পিসের দাম ২০০ টাকা।

৪২ বছর ধরে রান্নাঘরের দায়িত্ব হাসিনার

সালাম হোটেলের দীর্ঘ পথচলার আরেক সাক্ষী হাসিনা বেগম। টানা ৪২ বছর ধরে তিনি এই হোটেলে রান্নার কাজ করছেন। কিশোরী বয়সে মসলা বাটার কাজ দিয়ে হোটেলে তার পথচলা শুরু। সময়ের সঙ্গে কাজ শিখে এখন তিনিই হোটেলের প্রধান বাবুর্চি।

হাসিনা বেগম জানান, কাঠের লাকড়ি দিয়ে তিনটি চুলায় রান্না করা হয়। সকালে বাজার থেকে মাছ কিনে আনার পর শুরু হয় পরিষ্কার ও কাটাকাটির কাজ। এরপর রান্না। বেলা ১টার মধ্যেই খাবার প্রস্তুত হয়ে যায়।

তার দাবি, প্রতিদিনের মসলা ও রান্নার উপকরণ সেদিনই ব্যবহার করা হয়। বাসি কোনো খাবার বা উপকরণ এখানে ব্যবহার করা হয় না। এভাবেই বছরের পর বছর খাবারের স্বাদ ও মান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা।

Capture

শরীয়তপুর সদর উপজেলার শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দা খান মোহাম্মদ শীহান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। দাপ্তরিক প্রয়োজনে তাকে প্রায়ই নড়িয়া উপজেলা সদরে যেতে হয়। আর নড়িয়ায় থাকলে দুপুরের খাবারের জন্য তার পছন্দের জায়গা সালাম হোটেল।

শীহান খান বলেন, একেবারে বাড়ির মতো রান্না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নদীর টাটকা মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার খেতে পারি। খরচ একটু বেশি। তবে নদীর টাটকা মাছ হওয়ায় সেটা নিয়ে সমস্যা হয় না।

শুধু শীহান খান নন, নিয়মিত অনেক ক্রেতাই এই হোটেলের পুরোনো স্বাদের সঙ্গে পরিচিত। কেউ কাজের ফাঁকে দুপুরের খাবার খেতে আসেন, আবার কেউ দূর থেকে এসে খোঁজ করেন টাটকা নদীর মাছের।

 

আব্দুস সালাম জানান, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ তার হোটেলে খাবার খান। দৈনিক বিক্রি হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। হোটেলে কাজ করেন মোট সাতজন। তাদের মধ্যে তিনজন রান্নার দায়িত্বে এবং চারজন খাবার পরিবেশন ও বিক্রির কাজ করেন।

জীবনের ৮৪টি বছর পার করেছেন আব্দুস সালাম। পাঁচ মেয়ের সবাইকে বিয়ে দিয়েছেন। বয়সের কারণে শরীরে ক্লান্তি এলেও হোটেলের প্রতি তার টান এখনো কাটেনি।

আব্দুস সালাম বলেন, নদীর মাছ বিক্রি করি বলেই দূরদূরান্ত থেকে অনেক ক্রেতা এখানে আসেন। টাটকা মাছ না পেলে সেদিন হোটেলই বন্ধ থাকে। মানুষের ভালোবাসা আছে বলেই এত বছর ধরে হোটেলটি টিকে আছে।

একসময় যে ব্যবসা শুরু হয়েছিল নদীর ঘাটে, সময়ের স্রোতে তার ঠিকানা বদলেছে। বদলেছে বাজার, মানুষের জীবনযাত্রা ও খাবারের ধরনও। কিন্তু বদলায়নি টাটকা মাছ আর ঘরোয়া রান্নার সেই পুরোনো স্বাদ। আর সেই স্বাদই যেন ছোট্ট একটি ঘরকে ধরে রেখেছে নড়িয়ার মানুষের স্মৃতিতে—এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে।

প্রতিনিধি/টিবি