Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

স্বাক্ষর সরকারি হাজিরা খাতায়, দুই নারী কর্মচারীর কাজ প্রশাসকের বাসায়!

জেলা প্রতিনিধি

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভায় অফিস সহায়ক পদে চাকরি করেন রিতা রানী ও নাসিমা বেগম। দাপ্তরিক দায়িত্ব অনুযায়ী পৌরসভার কার্যালয়ে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করার কথা তাদের। অথচ অভিযোগ উঠেছে, অফিসের কাজের পরিবর্তে তাদের দিয়ে পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাসের বাসায় ব্যক্তিগত কাজে সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। এমনকি বাসায় গিয়ে কাজ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে চাকরি হারানোর ভয় দেখানোর অভিযোগও উঠেছে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার ফিরোজ আহমেদের বিরুদ্ধে। যদিও চাকরিচ্যুতির হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, অফিস সহায়ক রিতা রানী প্রতিদিন সকালে পৌরসভায় এসে হাজিরা দেওয়ার পর পৌর প্রশাসকের বাসায় চলে যান। প্রায় তিন ঘণ্টা পর দুপুর ১টার দিকে তাকে আবার পৌরসভা কার্যালয়ে ফিরতে দেখা যায়। রিতা রানী নিজেই জানিয়েছেন, তিনি প্রশাসকের বাসা থেকে কাজ করে অফিসে ফিরেছেন।

শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস
শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস

পৌরসভার কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রিতা রানী প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে অফিসে এসে হাজিরা দেন। এরপরই তাকে প্রশাসকের বাসায় যেতে হয়। সেখানে কাজ শেষে দুপুর ১টার দিকে তিনি আবার পৌরসভা কার্যালয়ে ফেরেন।

সরেজমিনে বিষয়টি যাচাই করতে পৌরসভা কার্যালয়ে গিয়ে রিতা রানীকে পাওয়া যায়নি। পরে তার জন্য অপেক্ষা করা হলে দুপুর ১টার দিকে তাকে কার্যালয়ে ঢুকতে দেখা যায়।

এ সময় তার সঙ্গে কথা হলে রিতা রানী জানান, তিনি পৌর প্রশাসকের বাসা থেকেই কাজ করে ফিরেছেন।

সপ্তাহে কতদিন তাকে এভাবে বাসায় যেতে হয় জানতে চাইলে এই কর্মচারী বলেন, ‘প্রতিদিনই যেতে হয়।’

পৌরসভার একাধিক কর্মচারী অভিযোগ করেন, শুধু রিতা রানী নন, আরেক অফিস সহায়ক নাসিমা বেগমকেও মাঝে মাঝে প্রশাসকের বাসায় যেতে হয়।

তাদের দাবি, দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগত বাসার কাজে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার ফিরোজ আহমেদ চাকরি চলে যাওয়ার ভয় দেখান।

শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার অফিস সহায়ক রিতা রানী
শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার অফিস সহায়ক রিতা রানী

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার এক কর্মচারী বলেন, প্রতিদিন রিতা রানীকে স্যারের বাসায় কাজের জন্য পাঠানো হয়। তিনি যেতে না চাইলে চাকরি চলে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়। মাঝে মাঝে রিতা রানী ও নাসিমা বেগম দুজনকেই একসঙ্গে বাসায় যেতে হয়।

ওই কর্মচারীর দাবি, অফিস সহায়ক পদে থাকা একজন কর্মচারী দিনের একটি বড় সময় পৌরসভা কার্যালয়ের বাইরে থাকায় দাপ্তরিক কাজে অন্য কর্মচারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

স্যারের অনুরোধে আমি পাঠাই: নির্বাহী প্রকৌশলী

অভিযোগের বিষয়ে নড়িয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার ফিরোজ আহমেদের সঙ্গে কথা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

তবে তিনি বলেন, ‘স্যারের (প্রশাসক) এখানে (বাসায়) কেউ থাকেন না। ছোট একটা মেয়ে নিয়ে থাকেন। তার বাসায় পার্মানেন্ট কাজের মানুষ আছে। তবুও মাঝে মাঝে রিতা তার মেয়েকে একটু রাখতে যায়। স্যারের অনুরোধে আমি পাঠাই।’

শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভা
শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভা

তবে রিতা রানী ও নাসিমা বেগমকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

এ সময় প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘স্যারের জন্য কিছু করলেও তিনি কখনো খুশি হন না, তিনি সবসময় আরও চাইতেই থাকেন।’

আমার মেয়েকে একটু রাখার জন্য বাসায় পাঠাই: প্রশাসক

নড়িয়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাসের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনিও ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।

তবে বাসায় পৌরসভার কর্মচারীদের পাঠানোর কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি ছোট একটা বাচ্চা নিয়ে একা থাকি। আমার বাসায় পার্মানেন্ট কাজের লোক রয়েছে। তবে মাঝে মাঝে রিতাকে আমার মেয়েকে একটু রাখার জন্য বাসায় পাঠাই।’

আরও পড়ুন: পদ্মা নদী থেকে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

পৌরসভার কর্মচারী দিয়ে ব্যক্তিগত বাসার কাজ করানো যায় কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমি পারি না। তবে মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে নিতে হয়। এটা একটা ছোট বিষয়। যেহেতু আপনারা বলেছেন, তাকে আর বাসায় নেব না।’

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে নড়িয়া পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস।

ইউএনও বললেন ‘মানবিক’ বিষয়

বিষয়টি নিয়ে নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টা একটু মানবিক। তিনি এখানে একা থাকেন, বাসায় তার ছোট মেয়ে থাকে।’

তবে তিনি এও বলেন, ‘পৌরসভা আমার অধীনস্থ না, তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না।

‘যদিও এসিল্যান্ড হিসেবে তিনি আমার সহকর্মী। সেই ক্ষেত্রে আমি তাকে বলতে পারি, যেন এ ধরনের কাজ সে আর না করে।’

আরও পড়ুন: রামঠাকুরের ধ্যানঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেন মন্দির কমিটির দুই নেতা!

এদিকে পৌর প্রশাসকের বাসায় পৌরসভার কর্মচারীদের দিয়ে নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত কাজে সহযোগিতা নেওয়ার অভিযোগ এবং দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরে তাদের ব্যবহার নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজে পৌরসভার কর্মচারীদের আর ব্যবহার করা হবে না বলে জানিয়েছেন প্রশাসক লাকি দাস।

প্রতিনিধি/এএম